মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

" সমীরণ " - দ্বিতীয় খন্ড | তিতির দত্তগুপ্ত


               "হ্যালো নবমী!!" এই কণ্ঠস্বর শুনে আনন্দে উত্তেজিত হয়ে নবমী বলল, "বাবুই তুই কেমন আছিস? কোথায় আছিস? ঠিক আছিস তো? ভয় পাস না, মনে জোর রাখ..." নবমীকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মিশমী ফিসফিস করে শুধু বলল "পুরনো শিব মন্দির", বলেই ফোনটা কেটে দিল।
তখনই তিন বন্ধু মিলে কাবুল দার কাছে গিয়ে সবটা বলে। খোঁজ শুরু হয় পুরনো শিবমন্দিরের। গ্রীন গার্ডেন পার্ক থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলে একটা ভাঙাচোরা মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়। মন্দিরের চারপাশে কালো মুখোশধারীদের অতন্দ্র প্রহরা। সেই ঘেরাটোপ সামলে ঢুকতে গেলে একটু সাবধানতার প্রয়োজন, আর প্রয়োজন একটা পরিকল্পনার।

ঠিক হয় কীর্তনীয়ার ছদ্মবেশে মিশমীকে উদ্ধার করতে যাবে পুলিশ ফোর্সের সঙ্গে এবং পুরনো শিব মন্দির সন্ধান করতে করতে হঠাৎ একদিন তারা কাবুলদার কথামত সমস্ত পুলিশ দিয়ে পুরো মন্দির ঘিরে ফেলা হল। তারা জয় রাধেশ্যাম,  জয় রাধেশ্যাম বলতে বলতে ভিতরে প্রবেশ করে দেখে একটি চেয়ারের সাথে মিশমীকে বেঁধে রাখা হয়েছেl প্রিপারেশন অনুযায়ী ওরা ক্রমাগত নামগান করতে থাকবে, আর সেই সুযোগে নবমী মীশমিকে উদ্ধার করবে। কিন্তু বিধি বাম, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মিশমীকে দেখে নবমী নিজের আবেগকে আর সংযত করতে পারল নাl সে ছুটে গিয়ে বাঁচাতে গেল কিন্তু সহজ ও রনিত নবমীকে বাধা দিল। এতে  অপহরণকারীরা বুঝে গিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করল। নবমী নিজের জীবনকে বিপন্ন করে মিশমীর হাতে পায়ের বাঁধন খুলে মিশমীকে জড়িয়ে ধরলো আর কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আই এম সরি, আই এম রেস্পন্সিবল ফর দ্যাট।" ভেতর থেকে অনবরত গোলাগুলির আওয়াজ শুনে পুলিশ ততক্ষণে  মন্দিরে ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে অপহরণকারীদের একজন নবমীকে গুলি করতে গেলে তা সহজের চোখে পড়ে যায়। সহজ নবমীকে ঠেলে সরাতে গেলে,গুলিটা সহজের হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। অপহরণকারীদের সকলকে পুলিশ গ্রেফতার করে ও মীশমীকে উদ্ধার করা হয়। এই কদিনে মিশমী যে মানসিক শক পেয়েছে সেটা দূর করার জন্য তাকে কাবুলদার বাড়িতে রাখা হয়। সহজের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সংবাদপত্র টিভি চ্যানেলের দৌলতে কোনো কিছুই আর অপ্রকাশিত রইল না। ওদের জীবনে এতবড় একটা ঘটনা, তাও আবার পুলিশী হস্তক্ষেপ— মীশমীর পরিবারে নবমী আর ওর সম্পর্ক ঘিরে একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। এটা আরো স্পষ্ট হয়ে যায় নবমীর মীশমিকে দেওয়া কিছু চিঠি, আর কিছু কার্ড দেখে। যাতে এই সম্পর্কের পরিধির আর ব্যাপ্তি না হয়, মীশমীকে ভয় দেখিয়ে নবমীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য মীশমীকে কড়া  পাহারায় বাড়িতে আটকে রাখে এবং সব যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলেজ যাওয়ার সুযোগ পেলেও তাও কড়া পাহারার মধ্যে। শুধুমাত্র সহজের ফোনে ভিডিও কলিং ছাড়া মীশমি নবমীর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। দুজনেই খুব কষ্টে আছে। মনের মাঝে ওদের একসাথে কাটানো স্মৃতিগুলো শরতের মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে— কোনোটাতে বৃষ্টি তো কোনটাতে মিষ্টি রোদ্দুর। একদিন নবমী বুদ্ধি করে একটা চিরকুট লিখে সহজকে দিল মীশমির কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। চিরকুটে লেখা ছিল "কাল ৩.১৫ এর  Digital Electronics এর লেকচার অফ থাকবে, ওই সময় কলেজের পিছনের গার্ডেনে দেখা করব। তুই পিছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে আসবি আমি ওখানেই তোর জন্য অপেক্ষা করবো, সহজ, রণিত তোর বর্ডিগার্ড গুলোকে দেখে নেবে।" মিশমী যথা সময়ে কলেজ গার্ডেনে পৌঁছলো। কলেজের গার্ডেনের চারিদিকে ফুলের বাগান, আর লাল গোলাপ বাগিচা। গার্ডেনে গিয়ে নবমীকে দেখতে না পেয়ে মীশমি নাম ধরে ডাকলো, তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল। হঠাৎ পিছন থেকে মিশমীর চোখ দুটো কেউ হাত দিয়ে চেপে ধরল। নবমীর স্পর্শ  মিশমীর কাছে অজানা নয়। তখনই মিশমী ঘুরে নবমীকে জড়িয়ে ধরল। "অনেকদিন পর আজ একটু শান্তি পেলাম। এতদিন শুধু শরীরটাই ছিল কিন্তু প্রাণটা তোর কাছে ছিল। সেটা আজ ফিরে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের জমানো অনুভূতি গুলো আদরের চাদরে ঢেকে নিল। কিনতু এইভাবে তো বেশি দিন তো চলতে পারে না। সামনেই ক্যাম্পাসিং, ফাইনাল প্রজেক্ট। তারপরই তো সব শেষ। এদিকে সহজ, রণিত সময় শেষের সিগন্যাল দিচ্ছে। মীশমী নবমীকে আশ্বাস দিল, "সব হবে। তবে আমাদের এখন একটাই কাজ,  ক্যাম্পাসিংয়ে যেকোনো প্রকারে একটা চাকরি পাওয়া ।

——————————

মীশমি আর নবমী দুজনেই এখন হায়দ্রাবাদের এক নামকরা মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কর্মরতা। যদিও অনেক কসরতের পর কাবুলদার এক বন্ধুর সহযোগিতায় হায়দ্রাবাদে পোস্টিং নিয়েছে নবমী। সহজ এবং রণিত দুজনেই হায়ার   স্টাডিজের জন্য হায়দ্রাবাদে, সাথে একটা কোম্পানির হয়ে প্রজেক্টের কাজও করছে। মীশমি কোম্পানি থেকে সুসজ্জিত ফ্ল্যাট পেয়েছে, ওখানেই ওরা তৈরী করে নিয়েছে নিজেদের ভালোবাসার সুখী গৃহকোণ। নবমীর ফ্যামিলি থেকে কোন প্রবলেম নেই, ওনারা সম্পর্কটা বেশ মেনেই নিয়েছেন। কিন্তু মীশমির ফ্যামিলি এখনও মেনে নিতে পারেনি। শতসহস্র বাধা দেওয়া সত্বেও মেয়ের জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছেন তারা। দৈনিক রোজনামচা, অফিস থেকে ফিরে গৃহস্থালীর টুকটাক কাজ, অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট, সপ্তাহান্তে কাছে পিঠে ঘুরতে যাওয়া, শপিং, মুভি বেশ ভালোই চলছে। 

এইরকমই একদিন ওরা নিজেদের গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। বেশ ফুরফুরে মেজাজে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। গাড়ির স্টিয়ারিং নবমীর হাতে। হঠাৎই চোখে একটা তীব্র আলো আর সঙ্গে প্রচণ্ড ঝাকুনি। হতচকিত হয়ে শেষ মুহূর্তে কন্ট্রোল করতে গিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি নবমী। গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মারল একটা ল্যাম্পপোষ্টে। তারপরই সব অন্ধকার। মীশমীর আর কিছু মনে নেই।

অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে সহজ, রণিত তড়িঘড়ি হসপিটালে পৌঁছোয়। দুজনেরই  সিরিয়াস অবস্থা, তবে নবমীর অবস্থা আরো বেশী ক্রিটিকাল। নবমীকে ICU তে রাখা হয়েছে। 
দুজন গেল ডাক্তারের সাথে কথা বলতে। মীশমীকে মেডিসিন, ব্লাড দেওয়া হচ্ছে। মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব চলছে। তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি। দুটো ছোট অপারেশন করতে হতে পারে। সেগুলো সময় মত জানাবো। যেহেতু জ্ঞান ফেরেনি এখনো তাই ৪৮ ঘন্টা না কাটলে কিছু বলা যাচ্ছেনা। 
"আর নবমী?" জিজ্ঞাসা করল রণিত।
— আমাদের হাতে আর কিছু নেই, আপনারা ওর সাথে দেখা করে নিন।
কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বলল রণিত, "আপনাদের হাতে কিছু নেই মানে কী? কি করতে হবে বলুন, সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবো। কিন্তু নবমীকে যেভাবে হোক বাঁচিয়ে তুলুন।"
— Clam down my child... নবমীর ব্রেন হেমারেজ হয়ে এত ব্লিডিং হয়েছে যে সেটা আর পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। হার্ট পুরো শরীরে ব্লাড সারকুলেট করতে পারছে না।  যা ব্লাড দেওয়া হচ্ছে, সেটাও আর শরীর নিতে পারছে না, বডি সাপোর্ট করছে না। রক্তে লিপিডের পরিমান খুব বেড়ে গেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে একে বলে Coronary Thrombosis। আর তাছাড়া, যে বাঁচতে চায় তাকে বাঁচানো যায়। কিনতু উনি তো কোনো ট্রিটমেন্টই নিতে চান না। যাই হোক, উনি সহজ নামে কারোর সাথে দেখা করতে চান।
ওরা দৌড়ে গেল। সহজ নবমীকে ঐ অবস্থায় দেখে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। নবমী সসজকে দুখেই ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরল, "আমাকে ছুঁয়ে কথা দে, তুই মীশমিকে  আগলে রাখবি। ওকে কখনো জানতে দিবি না আমি আর তোদের মধ্যে নেই, আমাকে প্রমিস কর সহজ। না হলে, আমি মরেও শান্তি পাব না।"
— তোর ভালোবাসাকে আমি কি তোর মত করে আগলে রাখতে পারব? না  তোর মতো নিঃস্বার্থ ভালবাসতে পারব?
নবমী উত্তেজিত হয়ে বলে, "তুই পারবি, পারতে তোকে হবেই..." কথাটা বলেই নবমী চুপ করে যায়। তার মাথাটা কেমন নেতিয়ে পড়ে। রণিত দেখে Cardiac Monitoring  System এ হার্ট বিট ফলাকচুয়েট করছে। ওর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ক্রমশ কমছে, নবমী প্রাণপণ চাইছে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আরো একটু বেঁচে থাকতে, আরো কিছু বলতে। কিনতু শেষ কথাটা বলতে চেয়েও আর বলা হল না। সহজ দুবার নবমী, নবমী করে ডাকলেও আর কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। রণিত চিৎকার করে ডাক্তারবাবুকে ডাকে, ডাক্তারবাবু এসে ফোর্সফুলি হার্টবিট ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আর নবমীকে ফিরিয়ে আনা গেল না...........এক নিমেষে সব শেষ।

নবমীর মা, বাবা এই আকস্মিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন। একমাত্র মেয়েকে হারাবার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছেন না। সহজ, রনিত যে তাদের কি বলে সান্ত্বনা দেবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
অফিসিয়াল যা যা ফরম্যালিটি ছিল,সহজ গিয়ে শেষ করল। কিন্তু এর পরেও একটা গুরুদায়িত্ব থেকে যায়। সহজ আর রনিত কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ওরা অনুমতি নিল যাতে নবমীর শেষকৃত্য  হায়দ্রাবাদেই করতে পারে, আর  মীশমি সুস্থ হলে ওকে নিয়েই ফিরবে।

শেষকৃত্য শেষ করে যখন ওরা ক্লান্ত মনোরথে বাড়ি ফিরল তখন আর একটা নতুন দিনের সূর্য কিছু নতুন বার্তা নিয়ে উদিত হয়েছে। হসপিটাল থেকে জানায় মীশমীর জ্ঞান ফিরেছে।

—————————————-

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ পাঁচটা বছর। রনিত নিজস্ব কোম্পানি খুলেছে। বিয়ে করে কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা। সহজ এখন ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ইস্টার্ন শাখার সেকশন ইঞ্জিনিয়ার, মিশমিকে নিজের জীবনসঙ্গী  করেছে। যতটা পেরেছে মীশমিকে খুশী রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যখনই মীশমি নবমীর কথা জানতে চেয়েছে প্রত্যেকবারই এক কথাই বলেছে, ওইরকম ক্রাইসিস থেকে সুস্থ হওয়ার পর বিদেশে একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরী পেয়ে ওখানেই বিয়ে করে স্বামী সংসার নিয়ে সুখে শান্তিতে আছে। এই কথা বারবার শুনতে শুনতে মীশমিও একপ্রকার মেনেই নিয়েছে। কিন্তু মনে মনে কোনোদিনই মেনে নিতে পারেনি, একটু একটু করে রাগও মনের মধ্যে জমেছে।

একদিন রণিত ভিডিও কল করেছে সেই সূদুর কানাডা থেকে। অনেক বছর পর প্রিয় বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছে, একেবারে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছে। কথায় কথায় নবমীর কথা উঠতেই মীশমি খুব রেগে গিয়ে বলল, "ওর কথা ছাড় তো, ওর মতো স্বার্থপর কেউ আছে? নিজের সুখের চেয়ে ওর কাছে কিছু মানে রাখে? মুখেই শুধু ভালবাসি, ভালবাসি। ভালোবাসা বজায় রাখতে গেলে নূন্যতম যোগাযোগ রাখতে হয়। ভালোবাসা!! আমার একটা খোঁজ নিয়েছে? বিয়ে করেছে তো কি হয়েছে?"
রণিত মিশমীকে বোঝানোর জন্য কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই সহজ "আমি তোকে পরে কল করছি" বলে কলটা কেটে দিল। আর ফোনটা বন্ধ করেই মীশমিকে সপাটে একটা চড়। হঠাৎ সহজের এমন ব্যবহারে মিশমী হতবাক।
— মারলি কেন? 
— কি বলছিস তুই জানিস? তোর কোনো ধারণা আছে তুই কার সম্বন্ধে কী বলছিস? এই যে সুন্দর পৃথিবীটা দেখতে পাচ্ছিস.... কার জন্য? এই যে একটা সংসার পেয়েছিস..., কার জন্য? এই যে তুই একটা অন্য মীশমি হয়েছিস..... কার জন্য?
মীশমি কিছুই বুঝতে না পেরে বলল, "কি পাগলের মতো বকে যাচ্ছিস?"
— হ্যাঁ,  রে আমি পাগল!! তাই তোকে এতদিন কিছু জানাইনি।
এরপর সহজ বলতে থাকে সেই ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্টের কথা, যাতে মিশমীর দুটো চোখই নষ্ট হয়ে যায়। মুখমণ্ডল এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে প্লাস্টিক সার্জারি করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তোকে বাঁচানোর তো তবু অপশন ছিল। কিনতু নবমী তো আমাদের কোনো অপশনই দেয়নি। কারণ ও সেই সুযোগটাই নেয়নি। তোর ভালোবাসাকে আমরা হাজার চেষ্টা করেও সেইদিন বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু নবমী আজএ বেঁচে আছে তোর চোখে-মুখে। নবমীর শেষ ইচ্ছা ছিল ও তোর মধ্যে দিয়ে সারাজীবন আমাদের ছুঁয়ে থাকবে। আমরা ওর শেষ ইচ্ছেটা রাখতে পেরেছি শুধু। মিশমী এতটুকু শোনার পর নিজেকে আর ঠিক রাখতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে সহজের  বুকে পড়ে গেল। জ্ঞান ফেরার পর মীশমি কাঁদতে কাঁদতে সহজকে জিজ্ঞেস করে "বলিস নি কেন?? কেন?? ....নবমী সবসময়ই কেন জিতে যাবে?"
— তোর কষ্ট হবে তাই নবমীর বারণ ছিল.......। সহজ নবমীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

ওরা হঠাতই অনুভব করে একটা বাতাস কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে। তার সাথে একটা প্রাণোচ্ছল হাসির শব্দ। বলে যাচ্ছে কিছু কথা, "না রে, আমি শুধু একা জিতিনি। জিতেছিস তুইও, আমার সবটুকু নিয়ে। জিতেছে আমাদের নিঃস্বার্থ ভালবাসা। তোর মনের মধ্যে যদি বাঁচার তাগিদ না থাকত, আমার কোনো কিছুই তোর কাজে লাগত না। তোর মধ্যে দিয়েই তো আমি বেঁচে থাকব, আর বেঁচে থাকবে আমাদের "সমীরণ".....॥

                                                                                                               
                                                                       
                                                                  তিতির দত্তগুপ্ত ©


--------|| সমাপ্ত ||--------

" সমীরণ " - প্রথম খন্ড | তিতির দত্তগুপ্ত



                   ভালবাসার অর্থ কি? শুধুই কি ভালবাসা নাকি ভাল মনের ভালো বাসা? নাকি নিজেকে হারিয়ে অন্যের মধ্যে বেঁচে থাকা? সময় বলুক।

        গল্পের শুরু বাঁকুড়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সদ্য প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নতুন নতুন কিশলয় এবং তাদের  নতুন করে জীবন শুরুর এক পর্যায়। সহজ, মীশমি, রণিত, নবমী চারটি চিরসবুজ ছেলেমেয়ে কাউন্সিলিংয়ে গিয়ে  আলাপ। ৮-৯ ঘন্টা একসাথে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা হতে হতে প্রাথমিক বন্ধুত্ব হয়েই যায়। সহজ, মীশমি কম্পিউটার সায়েন্স  আর রণিত, নবমীর ইলেকট্রনিক্স। মীশমি কলেজ হোস্টেলে থাকে। আর বাকীরা পেয়িং গেস্ট। তাহলেও  কলেজে একসাথে যাওয়া-আসা, উইকএণ্ডে ঘুরতে যাওয়া, প্রজেক্টের কাজে একে অপরকে সাহায্য করা, সব কাজ তারা মিলেমিশে করে। এদের সুদৃঢ় বন্ধুত্ব দেখে গোটা কলেজ তাদের একটা নামও দিয়েছে "সমীরণ"। নতুন কলেজ, ফার্স্ট ইয়ার, সিনিয়র দাদা-দিদিদের আলাপ করার নামে ছোটখাটো ইন্টারোগেশন্ লেগেই আছে। ফ্রেশার্স ওয়েলকামও হয়ে গেছে। এরা চারজনই শিল্পকলায় পারদর্শী। বিভিন্ন জায়গা থেকে শো পায়, নিজেদের হাতখরচটা উঠে আসে। কলেজের  ক্লাসটেস্ট, সেমিস্টার, রাত জেগে পড়া আবার সকালে উঠে পরীক্ষা দিতে যাওয়া— সব ভালোই চলছিল।

ফার্স্ট সেমিস্টার শেষ, একটু শান্তি। একসাথে সবাই  কলেজ থেকে ফিরছে। হঠাৎই সহজ বলে, "এই জানিস, তোদের একটা খবর দেওয়া হয়নি। আমরা একটা বড় শো পেয়েছি, তবে রাতের  অনুষ্ঠান। বেশ ভালো রেমুনারেশন দেবে বলেছে।" শুনে রণিত বলে, "দেখিস, সাথে দুটো মেয়ে আছে। কোনোরকম অসুবিধা যাতে না হয়।"
"আমরা তোদের সাথে সাথেই থাকব, নো চাপস্"- নবমী উত্তরে বলে। এত কথা হচ্ছে কিন্তু মীশমি একদম চুপচাপ। নবমী মীশমির কাঁধে হাত রেখে বলে, "কি রে তোর কি হয়েছে? তোর কি শরীর খারাপ লাগছে? চুপচাপ কেন?"
— না তা নয়, এমনি কথা বলতে ভালো লাগছে না।
— বলছি নবমী, তুই আজ আমার সাথে  থাকবি?
নবমী হেসে বলে, "উমমমমম্ ঠিক হ্যাঁ  দোস্ত, থাকুম তর লগে।"
সহজ, রণিত  দুজন ঠিক করে, অনুষ্ঠান কিভাবে সাজাবে সেটার একটা আলোচনা করে নেবে। তাই সহজের গেস্ট হাউসে রয়ে যাবে। মীশমিও নবমীকে নিয়ে  হস্টেলে চলে আসে। দুজনেই ফ্রেশ হয়ে  টিফিন করে নিয়ে বসে আছে। নবমী গল্প করেই যাচ্ছে, মীশমি  শুনছে। মাঝে মাঝে হাসছে আবার উত্তরও দিচ্ছে, কিন্তু সেই প্রাণবন্ত  ভাবটা  নেই। কিছুটা টেনশনে আছে বলে মনে হচ্ছে। হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মীশমি বলে, "নবমী, আমি তোকে খুব ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। আমাকে ছেড়ে চলে যাবি না তো।"
— আমিও তোকে ভালোবাসি। তাছাড়া  আমরা  চারবন্ধুই একে অপরকে খুব ভালোবাসি, এটা নতুন কি আছে? তাছাড়া হঠাৎ এইরকম কথা....
মীশমি একদৃষ্টে  তাকিয়ে থাকে। হঠাৎই নবমীকে জড়িয়ে ধরে, ঠোঁটে প্যাশনেটলি চুমু খায়। এটার জন্য নবমী প্রস্তুত ছিল না। একঝটকায় মীশমিকে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। চিৎকার করে বলে ওঠে, "এটা  কি অসভ্যতামি!!! কি এসব??" ভয় পেয়ে মীশমিও সরে আসে। "তুই বিশ্বাস কর, আমি তোকে এতটাই ভালোবাসি, তোকে না দেখতে পেলে মনে হয় আমার চারপাশ  যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। তোকে কারোর সাথে একটু বেশী কথা বলতে দেখলে আমি সহ্য করতে পারি না। তুই শুধু আমার। এই অনুভূতি গুলোর শুরু তোকে যখন কাউন্সিলিংয়ের দিন প্রথম দেখি সেদিন থেকে, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারি নি। কেন যে আমার এইরকম হয়!!" মীশমি কাঁদতে কাঁদতে বলে।
নবমী মীশমিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, "ঠিক আছে, আমাকে একটু  ভাবার সময় দে, আমি তোকে সব জানাব। তুই একটু  ঘুমানোর  চেষ্টা  কর, আমি তোর মাথায়  হাত বুলিয়ে  দিচ্ছি।" মীশমি ঘুমিয়ে পড়ার পর নবমী রুমের বাইরে গিয়ে সহজকে ফোন করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। কিন্তু সহজ বা রণিত কেউই এই ব্যাপারে কিছু সমাধান দিতে পারে না। অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা যাবেনা। পরের দিন সকালে মীশমি ঘুম ভেঙ্গে চোখ খুলে দেখে নবমী  হাতের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ওর মাথায় চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, "কি সোনামণি, ঘুম হয়েছে?" নবমী জিজ্ঞাসা করে। মীশমি ঘুমচোখে বলে, "উমমমমম হয়েছে।"
"ভালোবাসা টেবিলে রাখা একটা শূন্য পাত্র। তুমি  যেভাবে তাকে ভরতে চাইবে, সে সেই ভাবেই ভরবে" হাসতে হাসতে বলে  নবমী। মীশমি তড়াক করে বিছানা থেকে উঠে আনন্দে নবমীকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে.... এইভাবে মান অভিমানের পালা চলার পর নবমী  বলে, "শুধু ভালোবাসলে হবে? দুদিন পর অনুষ্ঠান, প্রিপারেশনটা কে করবে শুনি!!"
——————————

বেশ জোর কদমে চলছে ওদের প্রস্তুতি। অনুষ্ঠানের দিন আসন্ন। এতবড় অনুষ্ঠান, কিছু প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বও সেখানে আমন্ত্রিত। প্রত্যেকেই  তাদের মা বাবাদের আমন্ত্রণ করেছে।

        অনুষ্ঠানের দিন সকালে সবাই কাছের একটা মন্দিরে পুজো দিতে গেল। বেলা ৩টে থেকে প্রোগ্রাম। উদ্যোক্তারা গাড়ি পাঠিয়ে দেবে সহজ-এর গেস্ট হাউসে,  ওখানে থেকে ওরা মীশমি আর নবমীকে তুলে নেবে। মীশমি, নবমী এখন একইসাথে থাকে। ফলে ওরা ওদের অনুভূতি গুলো একে অপরের সাথে শেয়ার করতে পারে। তার সাথে প্রচুর আদর, শাসন চলতে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে একটা কল্পিত স্বপ্নের  জাল বুনে চলে। ওরা ঠিক করে পড়াশোনা শেষ করে চাকরী নিয়ে বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে থাকবে।
যথাসময়ে গাড়ি এসে ওদের পিকআপ করে নিয়েছে। ওরা গাড়িতেই একবার রিহার্সাল দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওরা  দুটো গান সিলেক্ট করেছে (আমাদের গান তানিয়া from Madly Bangali আর K.K এর একটা গান, ইয়ারো দোস্তি), এর সাথে মীশমির কণ্টে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'উলঙ্গ রাজা' আবৃত্তি আর নবমীর সহযোগী নৃত্য। খোলা আকাশের নিচে সুন্দর মঞ্চ, চারিদিকে লোকারণ্য তাদের অনেকটাই অক্সিজেন দিল।

        ওদের বেশ ভালো লাগছে, ঝাঁ চকচকে গ্রীনরুমে ওরা বসে আছে। মনের মধ্যে চাপা টেনশন ও আছে। উদ্যোক্তারা জানিয়ে যান, যেসব প্রথিতযশা শিল্পীদের আসার কথা ছিল তাঁরা এসে গেছেন। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, মালবিকা বসু, অঞ্জন দত্ত এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "আমি সাধারণ মেয়ে" আবৃত্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন। এবার ওদের পালা। সহজের গিটারের এক মনোমুগ্ধকর মূর্চ্ছনায় প্রথমেই ওদের গ্রুপ পারফরমেন্স "ইয়ারো দোস্তি" গোটা অডিটোরিয়ামকে গলা মেলাতে বাধ্য করল। এরপর মীশমির গলায় "উলঙ্গ রাজা" শুনে অভিভূত হয়ে  বিশেষ অতিথির আসন থেকে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্টেজে এসে অনেক আশীর্বাদ করলেন। অতিথি আসনে যেখানে স্বয়ং অঞ্জন দত্ত বসে আছেন, সেখানে "আমাদের গান তানিয়া" আমরা একা কেন গাইব, অঞ্জন দত্তকে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিল রণিত। একটা বেশ সরগরম ব্যাপার। মীশমি আর নবমীর পারফরমেন্স শেষ, ওরা ড্রেস চেঞ্জ করতে রুমে চলে গেল। 
"উফফফ!!!! অ্যাটলিস্ট পারফরমেন্সটা ভালো করে উতরে গেছে, এবার খুব ক্লান্ত লাগছে রে...." বলেই নবমী ধপাস করে বসে পড়ল সোফায়। মীশমি দাঁড়িয়ে দেখছে নবমীর রকমসকম। তারপর বোদ্ধার মতো বলল, "হুমমম... কিন্তু তোকে এখন যা লাগছে না.....।"  নবমী  তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "এই তুই এখন বাইরে যা, আমি চেঞ্জটা করে নিই।"
— আররেরর... কেন আমার সামনেই কর না, সমস্যা কোথায়? আমি আর তুই কি আলাদা?
মীশমী হাসছে আর বলছে.... "সবসময় শুধু দুষ্টুমি, তাই না!! যা না বাবুই, লক্ষ্মী আমার। এখুনি মা-বাবা, ভাই দেখা করতে চলে আসবে" বলে নবমীকে একপ্রকার ঠেলেই রুম থেকে বের করে দিলো।

ওদিকে অনুষ্ঠান শেষ, সবাই খুব খুশি হয়েছে। উদ্যোক্তারাও খুব আনন্দিত হয়েছেন এবং রফা হওয়া টাকার থেকে একটু বেশিই ওদের খুশি হয়ে দিয়ে দিল। 
নবমী, মীশমি নিজেদের রুমে বসে আছে, নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।
— কাল তো ভ্যালেন্টাইনস ডে, আমাদের সম্পর্কের প্রথম ভালবাসা দিবস। আমরা সারাদিনটা খুব আনন্দ করবো। তোর কি উপহার লাগবে বল, নবমী বলল।
— আমার কিছুই লাগবে না। তুইই তো আমার সবচেয়ে পছন্দের উপহার। এর থেকে ভাল উপহার আর হতেই পারে না।

পরের দিন সকালে নবমী ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নেয়। রুমের জানলার পর্দা সরিয়ে দিতেই সকালের প্রথম রবি কিরণ মীশমির মুখে পড়ে তাকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে। মনে হচ্ছে পরম মমতার চাদরে যেন জড়িয়ে আছে।

"ওই বাবুই ওঠ ওঠ"..... নবমী ডাকছে। " শুভ ভালোবাসা দিবস মীশমি, অনেক অনেক আদর। (একটু আদর করার পর)চল তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব,তাড়াতাড়ি রেডি হ।
অবাক হয়ে মীশমি বলে, "এই সক্কাল সক্কাল কোথায় যাব?"
— চল-ই না।

শহর থেকে অনতিদূরে গ্রীন গার্ডেন পার্ক। চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। যদিও এটা একটা ম্যানমেড পার্ক, তবুও প্রকৃতি যেন তার রূপলাবণ্যে সেজে উঠেছে। সুন্দর নয়নাভিরাম পরিবেশ। নবমী আগে নেটে সার্চ করে দেখে রেখেছিল আর সাথে সাথে একটা গাড়ি বুক করে রেখেছিল। 
গাড়ি করে ওরা রওনা দিল, পথে অনেকবারই মীশমি জানতে চেয়েছে তারা কোথায় যাচ্ছে। নবমী বারবার একই কথা বলেছে, "এত অধৈর্য কেন? একটু সারপ্রাইজ থাক না!!"

পার্কের  কাছাকাছি আসতেই নবমী,  মীশমির চোখটা বেঁধে দেয়।
"আরে করছিসটা কী? জিজ্ঞাসা করে মীশমি। নবমী মীশমির হাত ধরে পার্কের মধ্যে নিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে, "একটু অপেক্ষা কর, আসছি।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে মীশমির চোখটা খুলে দিয়ে বলে, "দেখ তো তোর সারপ্রাইজটা পছন্দ হয় কিনা।"
মীশমি চোখ খুলে দেখে, ওর সামনে একটা টেবিলের উপর রাখা আছে এক তোড়া লাল-হলুদ গোলাপ, এক ঝুড়ি ক্যাডবেরি-চকলেট, আর একটা বড় টেডি, তাতে লেখা আছে "For My Valentine,  With Love,  Nabami"। মীশমি তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে নবমীকে জড়িয়ে ধরল, "I LOVE YOU TOO..।"

        হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে ওদের অনেকটা সময় কেটে গেছে। হঠাৎই বিকট একটা শব্দে পার্কটা কেঁপে উঠল। চারদিকে শুধু কালো ধোঁয়া, মানুষের ত্রাহি ত্রাহি রব। ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। নবমী এইরকম আকস্মিক ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেছে। "মীশমি... মীশমি..." বলে চিৎকার করছে, কিন্তু কোন উত্তর আসছে না।
কিছুক্ষণ পরে ধোঁয়াটে ভাবটা একটু পরিষ্কার হতে, চারদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মীশমিকে কোথাও দেখতে পেল না। নবমী এবার ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে কিছু মুখে কালো কাপড়ে ঢাকা বন্দুকধারী হঠাৎই পার্কে ঢুকে পড়ে বোমাবাজি করে। একটা ২২-২৩ বছরের মেয়েকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। পার্কের অথরিটির লোকেরা বাধা দিতে গেলে তাদের কয়েকজনকে বন্দুকের আঘাতে জখম করে পালিয়ে গেছে। নবমী মেয়েটার বিবরণ দিতেই তারা বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ... এইরকমই পোষাকে ছিল।" নবমী এবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে, কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। ততক্ষণে খবর পেয়ে লোকাল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করার চেষ্টা করছে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। নবমী পুলিশের কাছে গিয়ে মীশমির পুরো বিষয়টি জানালে একটা মিসিং ডায়েরি করার পরামর্শ দেন থানার আইসি। সহজ আর রণিত দুজনের কেউই বাঁকুড়াতে ছিল না। ওরা কিছুদিনের জন্য শান্তিনিকেতন গেছিল সহজের মাসতুতো দাদার বাড়ি। নবমীর কান্না ফোনের ওপার থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। কিছু গড়বড় হয়েছে এটা আন্দাজ করে নিয়ে দাদা বললেন, "কী হয়েছে রে পাপুন? (সহজের ডাক নাম)কিছু সমস্যা?" সহজ তখনি সব ব্যাপারটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে। শুনে তো মাথায় হাত দাদার। কিছু একটা চিন্তা করে বললেন, "আমি যেটা ভাবছি সেটাই যদি হয়, তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদেরকে অপারেশনে নামতে হবে। তার আগে থানার আইসির সাথে কথা বলতে হবে। তোরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাঁকুড়া থানায় পৌঁছা,  আমি একটা ফোন করে আসছি।"

সহজ, রণিত থানায় পৌঁছতেই নবমী ওদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সে বারবার একটাই কথা বলতে থাকে, "আমার জন্যই সবটা হয়েছে, আমার আরো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।" ওরা সান্ত্বনা দিয়ে বলে, "তোর তো এতে কোন দোষ নেই। এটা একটা আনএক্সপেক্টেড অ্যাক্সিডেন্ট। ভয় পাসনা সব ঠিক হয়ে যাবে,  আমরা থাকতে মীশমির কিছু হবে না।"
এদিকে নবমী এই পুরো ঘটনাটার জন্য নিজেকে দায়ী করে অনুশোচনার আগুনে পুড়তে লাগলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে সে থাকতে মিশমীর কোনরকম ক্ষতি হতে দেবে না। ইতিমধ্যেই একজন নিজের ইউনিফর্মে থানায় এসে ঢুকলেন, আইসির সাথে কেসটার ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বললেন। সহজ, রনিত ও নবমী দাদার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। সহজ দাদাকে ফোন করতে যাবে, তখনই পেছন থেকে পাপুন বলে কেউ যেন ডাকল। ফিরতেই দেখে কাবুল দা ওরফে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট সঙ্কর্ষণ রায়। ওরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "তুমি এই পোষাকে?"
— তোদের তো বলাই হয়নি। আমি মাস দুয়েক হল এখানে জয়েন করেছি।  ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দেব কিন্তু সেটা করার আর সময় হলো না। যাই হোক, কাজের কথায় আসি। মিশমীর কাছে যে একটি মোবাইল ফোন ছিল সেটার মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্রেস করা যায় কিনা সেটা দেখার জন্য বলে দিয়েছি। সমস্ত পুলিশ স্টেশনে মিশমীর ছবি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু খবর পেলেই তোদের জানাব। চিন্তা করিস না।
কাবুল দার কথায় সেদিন তিনজন ফিরে এসেছিল। কিন্তু মিশমীর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে যত দিন এগোচ্ছে নবমী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন নবমীর নাম্বারে একটি ফোন আসে। কিন্তু নবমী মানসিকভাবে এতটাই বির্পযস্ত যে কোনো ফোনকলই রিসিভ করেনা। দুবার তিনবার একইভাবে বেজে যাওয়ার পর নবমী কলটা রিসিভ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল।

                                                                   
                                                                  তিতির দত্তগুপ্ত ©



                                                       =>>  দ্বিতীয় খন্ড 

রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৯

ভালোবাসার অর্থ যখন "ত্যাগ" | অস্মি সেনগুপ্ত



             সৌম্য তার বাবাকে একটা খাতা দিয়ে বললো, "বাবা, স্কুলের ম্যাম সবাইকে বলেছেন জীবনে কার কি স্বপ্ন সেটা খাতায় লিখে নিয়ে যেতে। আমার  টা লিখে দাওনা।"
পুষ্পক কম্পিউটারে কাজ করতে করতেই বলল, "তোমার ম্যাম তোমাকে লিখতে দিয়েছে তো তুমি লেখো, আমি লিখে দিলে কি সেটা ঠিক হবে?"
― কিন্তু বাবা আমি তো লিখতে পারছি না। আর আমার কি স্বপ্ন আমি নিজেই তো জানি না।কখনো আমার ডাক্তার হতে মন চায়, আবার কখনো মনে হয় এরোপ্লেন চালাবো, আবার কখনো মনে হয় সমুদ্র পাড়ি দেব। কিন্তু আমি কি হবো বাবা?ও বাবা বলোনা, বাবা বলোনা।"
― কাজের সময় এইভাবে বিরক্ত করতে নেই।
কথাটা বলেই যেন কোথায় হারিয়ে যায় পুষ্পক। তার ছেলে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে থাকে আর নিজের মনে বলতে থাকে, নন্দিনী দেখো, আমাদের ছেলে ঠিক তোমার মত জেদি হয়েছে। তার পরেই ভাবে সৌম্যকে ওর ম্যাম স্বপ্ন নিয়ে লিখতে বলেছে। কিন্তু স্বপ্ন যে ওকে দেখতে দেবনা ঠিক করেছি। মা বলেছিল স্বপ্ন দেখলে নাকি ছেলেরা ভেলভেলে হয়ে যায়, যেমন আমি হয়ে গেছি। না, ওকে স্বপ্ন দেখতে দেওয়া যাবে না। ওকে বোঝাতে হবে স্বপ্ন বলে কিছু হয় না। ওকে বাস্তবটা ভালো করে শেখাতে হবে। কিছুতেই আমি আমার ছেলের জীবন নষ্ট হতে দেব না।
হঠাৎ সৌমিলির ঝাঁকুনিতে সম্বিত ফেরে পুষ্পকের।
―"কি গো, ছেলেটা এতক্ষণ ধরে তোমায় কিছু বলছে আর তুমি শুনছোই না।"
(সৌমিলি সৌম্যকে) "আয় বাবা খেয়ে নে, খাওয়ার পর আমি লিখে দেব।"
― না তুমি লিখে দেবে না। ওকে বলো স্বপ্ন বলে কিছু হয় না। জীবনে যা হবে কেউ আগে থেকে ঠিক করে রাখতে পারে না।
পুষ্পকের জেদের কাছে হার মানে সৌমিলি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে "খাবার টেবিলে খাবার দিয়েছি, খাবে এস।"
একটু আগে যা হলো তারপর কিভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারছেনা। তাও অনেকটা সাহস জুগিয়ে বিছানায় শোবার পর বলল, "আমরা কোনোদিন একা কোথাও ঘুরতে যাইনি। প্রত্যেকবার  হয় পরিবারের সবাই, না হয় তোমার হোমের সবাই, না হয় তোমার কলিগরা গেছে আমাদের সাথে। সামনেই ১৫ই অগাস্ট আমাদের ১০ম বিবাহবার্ষিকী। ওই দিন কি আমরা মানে শুধু তুমি আর আমি কোথায় ঘুরতে যেতে পারি?" বলেই তার চোখেমুখে যেন এক খুশির বাতাস বয়ে গেল।
ঘর অন্ধকার থাকলেও সেই খুশির আভাস পুষ্পক ঠিকই পেলো। সে জানতো তারা একা কোথাও ঘুরতে গেলে সৌমিলি ঠিক তার মনে পুরো জায়গাটা করে নিতে পারতো। কিন্তু তার মনে নন্দিনীর জন্য যে জায়গাটা আছে সেটা সে কিছুতেই তাকে দিতে পারবে না। ফুলশয্যার রাতেই তাকে জানিয়েছিল, "দেখো তোমার সব দায়িত্ব আমার। তুমি সব পাবে; ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা— সব। কিন্তু আমার মনে নন্দিনীর জন্য যে জায়গাটা আছে সেটা নষ্ট করতে বোলো না, তাহলে আমি আর বাঁচবো না।"

অনেক স্বপ্ন নিয়ে আসা নববধূ সৌমিলি কথাগুলো ঠিক মত বুঝতে না পারলেও কথাগুলো তার মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে গিয়েছিলো। সে হাসি মুখে বলেছিল, "ঠিক আছে তাই হবে।"
তারপর থেকে সৌমিলি তার শশুরবাড়িকে আপন করে নিয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যেই তার অগোছালো  শশুরবাড়ীকে ভরিয়ে তুলেছিল আনন্দে। পরে সবার কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিল, নন্দিনীর সাথে পুষ্পকের বিয়ে ঠিক হয়েছিল সম্বন্ধ করেই। দুই বাড়ি থেকেই সবাই খুব খুশি ছিল। নন্দিনী আর পুষ্পক তখন প্রেমের জোয়ারে ভাসছে। বিয়ে হতে আর কিছু দিন বাকি। হঠাৎ কোনো এক অজানা ঝড় এসে সব শেষ করে দিলো। বিয়েটা আর হলোনা। তার পরেই পুষ্পকের বাড়ির সবাই ভেঙে পরে। আর পুষ্পক পাগলের মতো হয়ে যায়। তার কষ্ট দেখে সবাই ভাবলো তার বিয়ে দিলে হয়তো পরিস্থিতির সামাল দেওয়া যাবে। তাই তারা সৌমিলির সাথে পুষ্পকের বিয়ের ব্যবস্থা করে। সৌমিলি পুষ্পরকের মায়ের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়ে। পুষ্পক প্রথমে না করলেও মায়ের কথায় বিয়েতে রাজি হয়। পুষ্পক আর সৌমিলির বিয়ের কিছুদিন পর নাকি নন্দিনী শিলিগুড়ি বেড়াতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে মারা যায়। যদিও তার ডেডবডি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেদিন সবটা জানার পর মনে মনে বলেছিল, "কি বোকা মেয়ে। এত ভালো পরিবার আর পাগলের মতো ভালবাসা বরকে ছেড়ে গেল কি করে। শুধু শুধু বিয়েটা ভেঙ্গে দিলো।" সৌমিলির মন যেন মানতে চায়না। ব্যাপারটা সবাই সহজ ভাবে নিলেও তার মোটেই সহজ মনে হচ্ছে না। সবাই নন্দিনীকে ভুল বুঝলেও তার মনে হচ্ছিল কোনো বড় কারণ আছে এর মধ্যে। কিন্তু সৌমিলির মন অত ভারী কথা নিতে পারে না। সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তার মনে হলো, ভাগ্যিস নন্দিনী সেদিন না করেছিল, নাহলে হয়তো তার কপালে এত ভালো শশুরবাড়ি আর এত ভালো বর জুটত না। আজ সৌমিলি সবার মনে নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে। পুষ্পকও তাকে খুব ভালোবাসে। তার সব ইচ্ছা পূরণ করে। নন্দিনী যদি তার মনের একটা অংশে থাকে তো ক্ষতি কি? সে তো এসে আর পুষ্পককে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে পারবে না। এইভেবেই সৌমিলি সব মেনে নিয়েছে হাসি মুখে।
পুষ্পক ভাবে যে সত্যি মেয়েটা আমাকে আর আমার পরিবারকে অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু ওকে নিয়ে কোথাও একা ঘুরতে যাওয়া হয়নি।
— "ঠিক আছে নিয়ে যাব। তুমি কোথায় যেতে চাও বলো আমি টিকিট বুক করে নিচ্ছি।"
কিছু না ভেবেই সৌমিলি হঠাৎ বলল, "আন্দামান"।
পুষ্পকের বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।সে আর নন্দিনী হানিমুনে আন্দামান যাবে ঠিক করেছিল।সব প্ল্যান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যাওয়া আর হল না।
নিজেকে সামলে নিয়ে পুষ্প বলল, "অন্য কোথাও গেলে হয় না? তুমি যেখানে বলবে সেখানেই নিয়ে যাবো কিন্তু আন্দামান আমার যেতে ইচ্ছা করছে না।"
সৌমিলি যাওয়ার খুশিতে এতটাই বিভোর যে পুষ্পকের কথা শুনেও শুনতে পেল না।
― আমি নেটে ছবিগুলো দেখেছি। খুব সুন্দর জায়গা। সৌম্যকে ওর দাদু ঠাকুমার কাছে রেখে যাবো, এই কয়েকটা দিন ওরা ম্যানেজ করে নেবে। আর আমি সব কিছু প্যাকিং করে নেব তুমি চিন্তা করো না। কিছু কেনাকাটা করার আছে সেগুলো তুমি আর আমি একদিন গিয়ে নিয়ে আসবো।"
সৌমিলির যাওয়া নিয়ে এত উৎসাহ দেখে পুষ্পক আর না করতে পারলো।
পুষ্পক তারা ভরা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো, "দেখো নন্দিনী তুমি চেয়েছিলে আমরা আন্দামান যাই, আমি আজ যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু তুমি কোথায়?"

যথাসময়ে পুষ্পক আর সৌমিলি পাড়ি দিলো আন্দামানে। ১৪ই অগাস্ট আন্দামান দ্বীপে নামলো দুজনে। সৌমিলি আবদার করেছিল ১৫ই অগাস্ট বিবাহবার্ষিকীর দিন ঘটা করে নীল ডাউন হয়ে লাল গোলাপ দিয়ে তাকে ভালোবাসার কথা জানাতে হবে। কথাগুলো পুষ্পকের কাছে বাচ্চাদের বায়না মনে হলেও সে একটা হোটেলে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।

১৫ ই অগাস্ট সকালে দুজনের সমুদ্রের ধারে ঘুরতে বেরিয়েছে।পুষ্পকের চোখ ক্যামেরার লেন্সে। ছবি তোলার শখটাও নন্দিনী যেন তার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল, যেটা সে আজও ছাড়তে পারেনি। হঠাৎ ক্যামেরার লেন্সে ভেসে উঠলো সেই পরিচিত মুখ। এ কি দেখেছে পুষ্পক? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কী স্বপ্ন দেখছে? নাকি এটা বাস্তব? এসব ভাবতে ভাবতেই সেই চেনা মুখটা আবার হারিয়ে গেলো। লেন্স থেকে চোখ সরিয়ে তাকিয়ে দেখল তাকে কেউ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কি করবে ভেবে না পেয়ে "নন্দিনী নন্দিনী" বলে তার পিছনে পাগলের মতো ছুটতে লাগলো।

অনিশ প্রথমে খেয়াল না করলেও কিছুক্ষণ পর তার খেয়াল হলো কেউ তাদেরকেই ডাকছে। ফিরে তাকাতেই দেখলো একজন ভদ্রলোক "নন্দিনী" চিৎকার করতে করতে তাদের দিকে আসছে।
সেই চেনা পরিচিত মেয়েটির হাতটা ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে পুষ্পক বললো, "কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? কত খুঁজেছি তোমায়। কেমন আছো?"
মেয়েটি বলল, "এক্সকিউজ মি!! হু আর ইউ?"
— আমায় চিনতে পারছো না? আমি তোমার পুষ্পক।
অনিশ ব্যাপারটা সামাল দিতে বলল, "আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আপনি হয়তো একে অন্য কারো সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। শি ইজ মাই ওয়াইফ, শ্রী।"
এতক্ষণ সব কিছু স্বপ্নের ঘোরের মতো লাগছিলো সৌমিলির। সে নন্দিনীকে কখনো দেখেনি, ছবিও দেখেনি। তাই সে বুঝতে পারছে না কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে। তবে তার সিদ্ধান্ত নিতে খুব একটা দেরি হলো না। কারণ এর আগেও পুষ্পক ওকে নন্দিনী বলে অনেকবার ডেকেছে। জ্বরের মধ্যেও নন্দিনীর নাম আউড়েছে। হয়তো মেয়েটিকে নন্দিনীর মতো দেখতে বলে সে এরকম করছে ভেবে বলল, "ক্ষমা করবেন।ওর ভুল করে ওনাকে নন্দিনী ভেবেছে। কিছু মনে করবেন না। আপনারা আসতে পারেন।"
কথাগুলো বলেই সৌমিলি পুষ্পকের হাত শক্ত করে ধরে উল্টো দিকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। পুষ্পক যেতে না চাইলেও সৌমিলির জেদের কাছে পরাস্ত। তাও সে সৌমিলিকে বার বার বোঝাতে চাইলো "ও আমার নন্দিনী।" যদিও পুষ্পক ব্যাপারটা নিজেই কিছুতে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাও চোখের সামনে নন্দিনীকে দেখে তার সত্য মিথ্যা সব মিলে মিশে এক হয়ে গিয়েছিল। শ্রীও তার স্বামী অনিশের হাত ধরে চলে গেল। অনিশ যদিও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু কেন যেন হতে পারছে না। কোথাও যেন অজানা ভয় তার মনে বাসা বেঁধেছে।

পুষ্পক অনেক খোঁজ করে দুপুরের মধ্যেই তাদের ঠিকানা জোগাড় করে তাদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত। দরজার কলিং বেল বাজানোর কিছুক্ষণ পরেই শ্রী এসে দরজা খুলল। হটাৎ সেই সকালের দেখা ভদ্রলোকটিকে দেখে কিছুটা ভয়েই চিৎকার করে উঠলো, "শুনছো, দেখো সেই লোকটি আবার এসেছে। কোথায় তুমি তাড়াতাড়ি এসো।"
হটাৎ এরকম চিৎকার শুনে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে পুষ্পক বলল, "দয়া করে চিৎকার করবেন না। আমি জাস্ট কিছু কথা জানতে চাই। খুব দরকার আমার উত্তর গুলো।"
এরমধ্যেই অনিশ আসে। শ্রীকে শান্ত করে বলে, "আচ্ছা আমি দেখছি ব্যাপারটা।তুমি চা করে নিয়ে এসো। আপনি ভেতরে আসুন।"
দুজনে চেয়ারে মুখোমুখি বসে কথপোকথন শুরু করলো।
— হ্যাঁ বলুন,কি বলতে চান।আর আমাদের বাড়িতেই আসার কারণটা কি?
— সব বলবো। আসলে আমার সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না।"
—আপনার যেখান থেকে সুবিধা মনে হয় বলুন"।
— আপনাদের কথা শুনে মনে হয়েছে আপনারা বাঙালী। মানে আপনাদের এখানে বাড়ি নয়। আর উনি কি আপনার স্ত্রী? আপনাদের কতদিন আগে বিয়ে হয়েছে?
— হ্যাঁ ও আমার স্ত্রী, শ্রী। আমাদের প্রায় নয় বছর আগে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু আপনি এসব জিজ্ঞাসা করছেন কেন? আপনি কে?
― ও সরি,আমার পরিচয় টাই দেওয়া হয়নি। আমি পুষ্পেন্দু বেরা। কলকাতায় থাকি। ওখানে আমার ছোট একটা বিজনেস আছে। এছাড়াও একটা বাচ্চাদের হোম আর একটা বাচ্চাদের স্কুল চালাই। যদিও অনেকেই আমাকে হেল্প করে। বুঝতেই তো পারছেন একা হাতে এত কাজ করা সম্ভব নয়।
― সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু আপনার আমার সাথে দরকারটা কোথায়?
― বলছি, সব বলছি। আসলে আপনার সাথে সকালে যাকে দেখেছিলাম মানে আপনার স্ত্রীকে হুবহু আমার নন্দিনী মানে আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের মত দেখতে। আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ কারণবশত ও বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারপর হটাৎ একদিন খবর পেলাম ও শিলিগুড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেছে। আজ তাকে জীবিত চোখের সামনে দেখছি অথচ সে আমাকে চিনতে পারছে না। হয় সে মিথ্যে বলছে অথবা এটা আমার মনের ভুল। আচ্ছা আপনার সাথে ওনার বিয়ে হলো কিভাবে? মানে ওনার সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে?
কথা গুলো শুনতে শুনতে অনিশের বুকের ভেতরটা যেন শূন্য হয়ে আসছিল। কি উত্তর দেবে খুঁজে পাচ্ছিল না। সেই সময় শ্রী চায়ের ট্রে নিয়ে এলো— "কী কথা হচ্ছে? অনিশ, উনি কে? কেন এসেছেন?তুমি ওনাকে চেনো?"
― তেমন কিছু না। আমার একটা কেস নিয়ে কথা বলছি। তুমি ওপরে গিয়ে রেস্ট নাও। আমি আসছি এক্ষুণি।
শ্রী বাধ্য মেয়ের মতো ওপরে চলে যায়।
― হ্যাঁ বলছিলাম যে ওনার সাথে আপনার বিয়ে হলো কি করে?
– বলছি। আপনি চা নিন।
― আগে আমার প্রশ্ন গুলোর উত্তর দিন। আমি আর এই রহস্য সহ্য করতে পারছি না।
― ওর সাথে আমার শিলিগুড়িতে প্রথম দেখা। আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। আমার পোস্টিং তখন শিলিগুড়িতে। একদিন সকালে পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওকে রাস্তার পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকতে দেখি। কাছে গিয়ে দেখলাম পালস চলছে তখনও কিন্তু খুব সিরিয়াস কন্ডিশন। কিছু না ভেবেই তাড়াতাড়ি রাস্তার মাঝে একটা গাড়ি থামিয়ে ওকে হসপিটালে নিয়ে যাই। ডক্টর দেখে বললেন যে ওদের হাতে কিছু নেই। খুব সিরিয়াস কন্ডিশন। তাও ওনারা সাধ্য মতো চেষ্টা করবেন। তবে দু দিনের মধ্যে ওর জ্ঞান না ফিরলে কোমায় চলে যাবে অথবা শরীরের একাংশ প্যারালাইসিস হয়ে যাবে। শুনে কিছুটা চমকে উঠলাম। ভাগ্যক্রমে  দুদিনের মধ্যে ওর জ্ঞান ফিরলো। কিন্তু ও কিছুই মনে করতে পারছিল না, ও কে বা ওর ঠিকানা কি? থানাতে কয়েকবার খোঁজ নিয়েও সুবিধা হয়নি। ওর সুস্থ হতে একমাস লেগেছিল। এর মধ্যে ওর কোনো খোঁজ খবর নেয়নি কেউ। পরে ডাক্তারের রিপোর্ট দেখে বুঝলাম ওর ব্রেইনের একটা অংশ ব্লক হয়ে গেছে তাই কিছু মনে করতে পারছে না। জোর করে কিছু মনে করতে চাইলে ওই অংশে চাপ পড়লে পাশাপাশি নার্ভগুলো ছিঁড়তে থাকবে, ফলে মৃত্যু অনিবার্য। তাই আমার ট্রান্সফার নিয়ে ওকে আন্দামান নিয়ে এলাম। কিছুটা স্বার্থের কারণেও বলতে পারেন। কারণ ওর সরল মুখখানা কিছুতেই যেন চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছিলাম না। নিজের অজান্তেই খুব ভালোবাসে ফেলেছিলাম। ও আমার সাথে আসতে কোনো আপত্তি করেনি। আর আমার তিনকুলে কেউ নেই। মা বাবাকে ছোটোতেই হারিয়েছি। আত্মীয়ও তেমন কেউ নেই। তাই কোনো অসুবিধা হয়নি। তারপর ওর সাথে থাকতে থাকতে বুঝলাম ওরও আমাকে ভালোলাগে। আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত আমি ওর সব আর ও আমার। তবে আমি ওর সাথে কথা বলে বুঝেছি ও খুব বড় আঘাত পেয়েছিল, যেটা ও সহ্য করতে পারেনি। তাই ওর মস্তিষ্কে ব্লকেজ হয়েছে। তাই ওকে যতটা পারি খুশি রাখার চেষ্টা করি।
কথা গুলো বলে যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিশ।
―আচ্ছা আপনার কথা অনুযায়ী যদি ও নন্দিনী হয় তো ওর এই মনের গভীর ক্ষতের কারণ কি জানেন? মানে কি এমন হয়েছিল? শুধু বিয়েটা ভাঙার জন্য?
―আপনাদের তো নয় বছর বিয়ে হয়েছে বললেন তো আপনাদের ছেলেমেয়ে কাউকেই তো দেখছিনা।
―নো, আমাদের কোনো ইস্যু নেই। আসলে শ্রীর একটা প্রবলেমের জন্য  কনসিভ করতে পারবে না। এই কারণেই কি আপনি ওকে বিয়ে করতে চাননি?
―না। বিশ্বাস করুন আমি এটা জানতাম না। ইন ফ্যাক্ট নন্দিনীই এই বিয়েটা ভেঙেছিল। আজ আমার কাছে সবটা জলের মতো পরিষ্কার। খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে আমার।

সৌমিলি এর মধ্যেই শাশুড়ীকে ফোন করে সকালের ঘটনাটা জানিয়েছে। এছাড়াও আজকের সন্ধ্যার ব্যাপারটাও জানিয়েছে। সে আজ খুব খুশি। ইতিমধ্যেই পার্লারের খোঁজ নিয়ে সেখান থেকে রেডি হয়ে গেছে। আজ যেন তাকে সব থেকে সুন্দর লাগে। কিন্তু সকালের ঘটনার পর ওর ভয় করছে। কোথায় যে পুস্পক বেরিয়ে গেল। আবার মনে মনে ভাবল, হয়তো ওকে কোনো সারপ্রাইজ দেবে সেটার ব্যবস্থা করছে। ইতিমধ্যে ও কয়েকবার ফোন করেছে কিন্তু সুইচড অফ আসছে। হয়তো এসে ওকে চমকে দেবে, তাই আগে থেকে যাতে বলে না ফেলে এই ভয়েই ফোন অফ করে রেখেছে। সৌমিলি নির্দিষ্ট জায়গায় পুষ্পেন্দুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে লাগলো। সে এই মুহূর্তটার জন্যই এতদিন অপেক্ষা করে আছে কিন্তু আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারছে না।
পুষ্পেন্দু তার চোখের জল আর ধরে রাখতে পারছে না। এতদিন ধরে সে যাকে দোষী ভেবে এসেছে সে আজ তাকে সব কিছু ফিরিয়ে দিয়ে নিজে নিঃস্ব হয়ে গেছে। সামনে বসে থাকা অনিশকে সে কি জবাব দেবে বুঝতে পারছিল না। নন্দিনীর এই অবস্থার জন্য যে শুধু সে দায়ী। তাই বলল, "নন্দিনীর বিয়ে ভাঙার কারণটা কেউ না বুঝলেও আজ বুঝতে পারছি। ওকে সবাই  ভুল বুঝেছিল, এমনকি আমিও। সবাই ওকে একটা খামখেয়ালি মেয়ে ভেবেছিল। তাই ওর আত্মীয়, বাবা-মা সবাই ওকে দোষ দিয়েছিল। আসলে সবাই ওকে খুব ভালোবাসতো। তাই এরকম কঠিন সিদ্ধান্তের পিছনে কারণ বুঝতে না পেরে ওকে ভুল বুঝেছিল। আর নন্দিনীও কাউকে ওর কষ্টের কথা বোঝাতে পারেনি। নিজেই গুমরে গুমরে শেষ হয়ে গেছে তবু কাউকে দোষ দেয়নি। আমিও বুঝতে পারিনি।যাকে এত ভালোবাসলাম তার কষ্টের কারণটাই বুঝলাম না!! যদি ওর কোনোদিন স্মৃতি ফেরে ওকে বলবেন ওর ইচ্ছা মত একটা বাচ্চাদের হোম করেছি, সেখানে অনাথ শিশুদের থাকার ব্যবস্থা করেছি। আর একটা বাচ্চাদের স্কুল, যেখানে গরিব ও অনাথ বাচ্চাদের ফ্রীতে পড়ার ব্যবস্থা করেছি। ওর সাথে আমি যে অন্যায় করেছি, এগুলো করলে ওর প্রতি অন্যায়টা যদি একটু কমে তাতেই আমি ধন্য। ওকে বলবেন ও আজ অনেক সন্তানের মা। আমার হোম আর স্কুলের নাম নন্দিনীর নামেই করা।"
তারপর পুষ্পেন্দু নিজের পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিয়ে বলল, "এই আমার কার্ড। যদি কখনো মনে হয় ওকে একবার নিয়ে যাবেন। আফসোস এটাই, যার জন্য এতকিছু করা আজ সে থেকেও দেখতে পারবে না। আপনারা ভালো থাকবেন। আসি।" বলে পুষ্পেন্দু দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। অনিশও তাকে অনেক কিছু বলতে চাইলো কিন্তু কোথাও যেন আটকে গেলো। বলতে গিয়েও বলতে পারল না। একছুটে ঘুমন্ত শ্রীর কাছে গিয়ে পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, "তোমায় আমি খুব ভালোবাসি শ্রী। আমাকে ছেড়ে কখোন যেও না।"

পুস্পকের কাছে আজ সব পরিষ্কার। নন্দিনী ওকে বারবার বোঝাতে চেয়েছিল যে ও মা হতে পারবে না। কিন্তু পুস্পক আর ওর বাড়ির সবার ওদের সন্তান হওয়া নিয়ে এত উৎসাহ দেখে সে তাদেরকে সত্যিটা বলার সাহস পায়নি। তাই সে বিয়ের পর হাজার লাঞ্ছনার চেয়ে বিয়ের আগে শত অপমান সয়ে সরে গেছে তার জীবন থেকে। তাই হয়তো ভগবান তাকে তার প্রাপ্য পুরস্কার দিয়েছে। তার বাবা মা আত্মীয় স্বজন সবার ভালোবাসা কেড়ে নিলেও অনিশের মতো একজনকে তার জীবনসঙ্গী হিসাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এসব ভাবতে ভাবতে পুস্পক হোটেলে ফিরে আসে। কিন্তু সৌমিলি কোথায়? হঠাৎ খেয়াল হয় সৌমিলিকে তো আজ ওর ভালোবাসার কথা জানানোর ছিল। এত দিন ধরে ও সৌমিলির সাথেও অন্যায় করেছে। সত্যি তো, সৌমিলির দোষটা কোথায়? ও নিজের ভালোবাসা পাবে না কেন? সৌমিলিকে আজ সব বলা দরকার। কিন্তু সৌমিলি কোথায়? ঘড়ির দিকে তাকালো পুস্পক। নয়টা বাজে। তাহলে কী সৌমিলি তিন ঘন্টা ধরে তার জন্য ওয়েট করছে?

পুষ্পেন্দু দৌড়ে হোটেলের ছাদে গেল যেখানে সে সবকিছু অ্যারেঞ্জ করেছিল। সেখানে গিয়ে দেখল সৌমিলি একা বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সৌমিলিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো পুস্পক।
― কী হয়েছে তোমার, কাঁদছো কেন? আর কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
― আমি তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো। তুমি আমাকে আর একটু সাহায্য করো।
― কি সব বলছো কিছুই বুঝতে পারছি না।
― বোসো সব বলছি।
তারপর পুস্পক তার জীবনের আজ পর্যন্ত সব ঘটনা বলল। সৌমিলিও তার চোখের জল আটকাতে পারলো না।
― ঠিক আছে, এত দিন পর্যন্ত তোমার সব কাজে আমি পাশে ছিলাম আজও থাকবো। শুধু তোমার এই বন্ধুসত্ত্বাটা আমাকে দিও।

আজ যেন সৌমিলির চোখের জল সুখের বার্তা নিয়ে এলো। আজ সে তার পুস্পককে ফিরে পেলো। আজ প্রথম পুস্পক নিজের থেকে তার মনের সব কথা সৌমিলিকে বলল। আজ যেন তারা নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো। শুরু হল তাদের নতুন পথ চলা।



                                                                                  © অস্মি সেনগুপ্ত

বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৯

নীরব আলো APRIL 2019 - PDF ডাউনলোড




নীরব আলো -  এপ্রিল  ২০১৯ " - একটি ছোট্ট এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রচেষ্টা আপনাদের মনোভাব সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার | আপনাদের মধ্য থেকেই  লিখিত সংগ্রহকে এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত করা হয় প্রতি মাসে |

পত্রিকাটি কোন রকম ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে ব্যবহিত করার জন্য নয় | এটি একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের মাসিক ই-পত্রিকা |

" নীরব আলো "এপ্রিল   ২০১৯ সংখ্যা প্রকাশিত হল আপনাদের জন্য  |  ডাউনলোড করুন ,পড়ুন ,আনন্দ উপভোগ করুন এবং এর সাথে নিচে কমেন্ট বাক্স এ আপনাদের মতামত ,অভিযোগ অবসায় জানাবেন  | আপনাদের মতামত নতুন লেখক লেখিকাদের আরো উৎসাহিত করবে  |

আপনারা সকলেই আমাদের মাসিক ই-পত্রিকাটি PDF ফাইল ফরম্যাট এ ডাউনলোড করতে পারবেন নিচের লিঙ্ক টিতে ক্লিক করে  | "ডাউনলোড" বোতামটিতে ক্লিক করলেই ডাউনলোড শুরু হয়ে যাবে | ধন্যবাদ


মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৮

" নীরব আলো " নভেম্বর ২০১৮ - PDF ডাউনলোড




নীরব আলো -  নভেম্বর ২০১৮ " - একটি ছোট্ট এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রচেষ্টা আপনাদের মনোভাব সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার | আপনাদের মধ্য থেকেই  লিখিত সংগ্রহকে এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত করা হয় প্রতি মাসে |

পত্রিকাটি কোন রকম ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে ব্যবহিত করার জন্য নয় | এটি একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের মাসিক ই-পত্রিকা |

" নীরব আলো "নভেম্বর  ২০১৮ সংখ্যা প্রকাশিত হল আপনাদের জন্য  |  ডাউনলোড করুন ,পড়ুন ,আনন্দ উপভোগ করুন এবং এর সাথে নিচে কমেন্ট বাক্স এ আপনাদের মতামত ,অভিযোগ অবসায় জানাবেন  | আপনাদের মতামত নতুন লেখক লেখিকাদের আরো উৎসাহিত করবে  |

আপনারা সকলেই আমাদের মাসিক ই-পত্রিকাটি PDF ফাইল ফরম্যাট এ ডাউনলোড করতে পারবেন নিচের লিঙ্ক টিতে ক্লিক করে  | "ডাউনলোড" বোতামটিতে ক্লিক করলেই ডাউনলোড শুরু হয়ে যাবে | ধন্যবাদ


সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৮

" পৃথক দুর্গা " | সানন্দা নন্দী


তোমার দুর্গা মাটির প্রলেপে নিখুঁত তৈরি প্রাণহীন মূর্তি
আমার দুর্গা অনুভূতি পূর্ণ রক্ত-মাংসে গড়া জ্যান্ত মানুষ রূপিণী
তোমার দুর্গার প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ধুমধামে মর্ত্যে আগমন
আমার দুর্গা এখনো অবাঞ্ছিত তাই মাতৃ গর্ভেই মৃত্যু বরণ
তোমার দুর্গা বেনারসী শাড়ী ও অলঙ্কারে সুসজ্জিতা
আমার দুর্গা ছেঁড়া বসনে কোনো ক্রমে লজ্জা নিবারণী
তোমার দুর্গার কুঞ্চিত সুবিন্যস্ত কেশরাশি
আমার দুর্গার তেলহীন অবিন্যস্ত রুক্ষ কেশরাশি
তোমার দুর্গা জগৎ জননী মহিষাসুর মর্দিনী
হায় ! আমার দুর্গা এখনো যে ধর্ষকের যৌন শিকার
তোমার দুর্গার অর্ঘ্যর তরে ব্যয় হয় রাজকোষ
হায় ! আমার দুর্গা মেধাবী হয়েও অর্থাভাবে মধ্য শিক্ষায় সমাপ্ত
তোমার দুর্গার ভরা সুখের সংসার স্বামী সন্তান নিয়ে
আমার দুর্গা পরে থাকে পিত্রালয়ে যৌতুকের অভাবে
তোমার দুর্গা সাগর পাড়ি দেয় পূজিত হবেন বলে
আমার দুর্গা আজো পতিতা হয় দারিদ্রতা ঘোচাতে
তোমার দুর্গা পূজিত হন ভক্তি ভরা মন নিয়ে
আমার দুর্গার দৈন্যদশা লাঞ্ছিত হয় প্রতি পদে
তোমার দুর্গা মণ্ডপে দাঁড়ায়ে সার্থক মনোরঞ্জিনী
হায় ! আমার দুর্গা শ্রম-ভালোবাসা দিয়েও ব্যর্থ মনোরঞ্জিনী
দশমীতে তোমার দুর্গা বিদায় নেন মিষ্টি মুখে সিঁদুর খেলা আর বরণের শেষে
আর আমার দুর্গা চির বিদায় নেয় অত্যাচারে অগ্নিদগ্ধা কিংবা অন্য উপায়ে ।।




স্বত্ব সংরক্ষিত

©  সানন্দা নন্দী

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

" নীরব আলো " অক্টোবর ২০১৮ - PDF ডাউনলোড




নীরব আলো -  অক্টোবর ২০১৮ " - একটি ছোট্ট এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রচেষ্টা আপনাদের মনোভাব সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার | আপনাদের মধ্য থেকেই  লিখিত সংগ্রহকে এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত করা হয় প্রতি মাসে |

পত্রিকাটি কোন রকম ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে ব্যবহিত করার জন্য নয় | এটি একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের মাসিক ই-পত্রিকা |

" নীরব আলো "অক্টোবর ২০১৮ সংখ্যা প্রকাশিত হল আপনাদের জন্য  |  ডাউনলোড করুন ,পড়ুন ,আনন্দ উপভোগ করুন এবং এর সাথে নিচে কমেন্ট বাক্স এ আপনাদের মতামত ,অভিযোগ অবসায় জানাবেন  | আপনাদের মতামত নতুন লেখক লেখিকাদের আরো উৎসাহিত করবে  |

আপনারা সকলেই আমাদের মাসিক ই-পত্রিকাটি PDF ফাইল ফরম্যাট এ ডাউনলোড করতে পারবেন নিচের লিঙ্ক টিতে ক্লিক করে  | "ডাউনলোড" বোতামটিতে ক্লিক করলেই ডাউনলোড শুরু হয়ে যাবে | ধন্যবাদ