সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

" ছন্দপতন " - সুফি রায়


নতুন মলজোড়াটা হাতে করে বসে আছে শফরী। গালে নোনা জলের দাগ বসে গেছে। গলা-বুক ভিজে গেছে জলে। কিন্তু চোখের জল যে আজ বাধা মানছে না কিছুতেই। যার কারণ খুঁজতে গিয়ে শফরী তোলপাড় করে ফেলছে তার চার বছর আগেকার জীবন।

    আসলে আজ তার জীবন থেকে চঞ্চল চলে গেল। চঞ্চল তার বন্ধু মাত্র। কিন্তু....। আসলে সেই কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকেই চঞ্চল ওকে ভালবাসে। শুধু ভালবাসে বললে অনেক কম বলা হয়। শফরীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবকিছুই ছিল চঞ্চলের ভালবাসা। কিন্তু শফরীকে সেটা জানিয়েই চরম ভুল করেছিল ও। তারপর থেকে এতগুলো বছর চঞ্চলকে এড়িয়েই চলছিল শফরী। এরমধ্যে সোহম এসেছে তার জীবনে। দুবছরের প্রেম পরিণতি পেতে চলেছে এবার। কিন্তু ঠিক তার আগেই জীবনের ছন্দটা একটু অচেনা সুরে বাজল।

    গতকাল বিকেলে হঠাৎ একটা অজানা নম্বর থেকে ফোন--
   -কি রে.. চিনতে পারছিস?
   -চঞ্চল তুই? কেন চিনব না?
    শফরী সত্যিই চিনেছিল। কেন চিনবে না সে? যতই হোক, খুব ভাল বন্ধু ছিল তারা।
   -বিয়ে করছিস যে জানালি না তো..?
   -আরে সেরকম কিছু নয়। আসলে তোর নম্বর ছিল না তো। তুই কোথায় পেলি আমার নম্বর?
   -মোহনের থেকে। যাই হোক,কাল একবার মিট করতে পারবি? তোর বিয়ের গিফ্টটা নিবি না? আমি তো আর তোর মত কিপটে নই।
    দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়েছিল।
   -এখনো আগের মতই আছিস দেখছি। ওকে.. তবে কাল বিকেলে  কলেজ 

স্ট্রীট মোড়,ওখান থেকে কফি হাউস। আবার আগের মতই।

আজ পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল শফরীর। রাস্তার ওপার থেকে তাকে দেখতে পেয়ে সাত দেখিয়ে সেখানেই দাঁড়াতে বলল চঞ্চল। ও আসছে এপাড়ে। আ..আ..! হঠাৎ তীক্ষ্ন হর্ন বাজিয়ে ক্যাঁচ শব্দ করে থেমে গেল গাড়িটা। মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে গেল শফরীর।

    তারপর থেকে সবকিছু কেমন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে ঘটে চলল। শফরী স্তব্ধ হয়ে গেছিল চঞ্চলের মৃত্যুর খবরটা শুনে। কানদুটো যেন ঝাঁ ঝাঁ করছে। একটু আগেই তো ছেলেটা দৌড়ে আসছিল তার সঙ্গে দেখা করতে,কথা বলতে। তবে?

   -মিস গাঙ্গুলি..?
    নার্সের ডাকে হুঁশ ফিরল শফরীর।
   -হ্যাঁ বলুন।
   -পেশেন্টের এই জিনিসগুলো..
    মনটা মোচড় দিয়ে উঠল। ওর বিয়ের উপহার নিয়ে এসেছিল ছেলেটা। শফরী ওকে ভালবাসা দিতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু এতবছর পরে এক নতুন জীবন শুরু করার আগে সে কোন তিক্ততা রাখতে চায়নি সম্পর্কে। তাই দেখা করতে আপত্তি করেনি। কিন্তু এ কি হল..? কাঁপা হাতে প্যাকেটটা নিল শফরী। তাতে একটা মাঝারি মাপের বাক্স। রঙীন কাগজের মোড়কে তার নাম লেখা। চোখটা একটু ঝাপসা হয়ে আসল তার। বাক্সটা খুলে দেখে তাতে একজোড়া মল। শফরী পায়ে মল পড়তে খুব ভালবাসে। এখনো। সব সময় পড়ে থাকে। মলের সঙ্গে একটা চিরকুট ও রয়েছে। তাতে লেখা- "তোর নতুন জীবনের প্রথম পদক্ষেপ হবে আমার ছন্দে বাঁধা। তোর প্রতিটা শফরী-চঞ্চল পদক্ষেপে বাজবে আমার জীবনের সুর-ছন্দ।"

মুহূর্তে শফরীর বুকটা ভিজে গেল চোখের জলে। শফরীর নতুন জীবন ঠিকই, কিন্তু ও কিছুতেই নিজের মনকে বোঝাতে পারল না কেমন করে ওর এই নতুন জীবনেরই ছন্দপতন ঘটে গেল।

                                                                                                 © সুফি রায়








" আতসবাজি " - সুফি রায়

        "যার বাপের খাওয়ানোর মুরোদ নেই তার বাজি পুড়িয়ে ফুটানি করা চলে না। পিন্ডি জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি.., আর লাট সাহেবের বেটি বাজি পোড়াবে..। সৎ মায়ের মুখ ঝামটা খেয়েই কেটেছে ঝিলমিলের সারাটা শৈশব। 

        "... .. দিদিইই...,আমার জন্য কী এনেছ??"
—-"আজকে একটা নতুন জিনিস এনেছি। এই বলে ব্যাগ থেকে প্যাকেটগুলো বের করে বোনের হাতে দিল ঝিলমিল।
—-"বাজিইইই..???? আআআ... মজা হবে।"

        রাতে আতসবাজির আলোয় যখন বোনের চোখদুটো চকচক করে ওঠে তখন ঝিলমিলের মধ্যেও জেগে ওঠে এক দ্বাদশী কিশোরী। আসলে মা তাকে সৎমেয়ে মনে করলেও বোনকে সে কখনোই সৎমায়ের মেয়ে ভাবেনি। তাই বোনের খুশিকে আকণ্ঠ পান করেই বাজি পোড়ানোর আশ মেটায় ঝিলমিল।

© সুফি রায়











" ভাইফোঁটা " - সুফি রায়



        নতুন বউ আসার পর থেকেই ভাইটা কেমন বদলে গেছে। ওকে মানুষ করার জন্য যে দিদি অবিবাহিত থেকেছে সেই দিদিকেই এখন ওর বোঝা মনে হয়। তাই বউকে নিয়ে চলে গেল আলাদা সংসারে। কিন্তু তাই বলে আজকের দিনেই চলে যাবে ও?? এভাবে, ভাইফোঁটা না নিয়েই!! দিদির কান্না কি ওর কানে গেলই না??

       ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশে নতুন বউ কান্নায় ভেঙে পড়েছে, "তোমার ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে দিদি।" শুনে হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল অসীমা। কিনতু পরক্ষণেই তার ফ্যাকাশে মুখে খেলে গেল এক ক্রূর নিষ্ঠুর হাসি... "দেখলি তো ভাই, আমার থেকে ফোঁটা না নিয়ে কি ভুল করেছিস..!!"

                                                                                                        ©  সুফি রায়















"আমি আছি.. আমি নেই" - অনির্বাণ রায়


কলেজ স্ট্রীট থেকে কেনা কবিতার সংকলনে..
বিকেলে শোনা রেডিওর প্রেমের বাংলা গানে
আমায় খুঁজিস না, ওখানে আমি তো নেই।

আমায় খোঁজ করে দেখ কলেজ নোটের পাতায়।
জুলজির কপিতে, B.K.D এর খাতায়
পেন্সিলের আঁচড়ে; আমার অস্তিত্ব থোর খাতাতেই।

ভালোভাবে খুঁজে দেখ—
আমি আছি তোর কলেজ নোটে।
আমি বাঁচি, তোর ভেজা ঠোঁটে।

DVD-র চেনা-অচেনা প্রেমের সিনেমাগুলোতে..,
সন্ধ্যাবেলায় cleansing milk-এর ভেজা তুলোতে
আমি থাকি না; সেখানে তো আমার থাকতে নেই।

অভ্যাসের বাইরে বেরিয়ে আনমনাদের হাত ধরে—
ঘুমের আচ্ছন্নতায় যদি কেউ এসে জড়িয়ে ধরে
তবে তো সে তোকে অবাধ্য হয়ে রূপকথা শোনাবেই।

ভালোভাবে শুনে দেখ,
আমি থাকি তোর রূপকথাতে।
আমি রাখি ভোর তোর ঘুমে ভেজা বালিশের মাথাতে॥


                                      ©  অনির্বাণ রায়













"একলা বসে" - সুফি রায়

যখনই থাকি একলা বসে
       তোমায় নিয়ে ভাবি,
তোমাকে আমার কবিতা করে
       হয়েছি তোমার কবি।

যখনই থাকি একলা বসে
      মনেতে ছবি আঁকি-
জ্যোৎস্না ভরা মুখখানাতে
      কাজল মাখা আঁখি।

মিষ্টি কথার দুষ্টুমিতে
      বাজল মনে বাঁশি,
লাল লাল ঐ ঠোঁটের কোণে
       এক চিলতে হাসি।

যখনই থাকি একলা বসে
       তোমায় খুঁজে বেড়াই..,
তোমার কথা ভেবে ভেবে
        এ মন যে তাই হারাই।

যখনই থাকি একলা বসে
         তোমায় যে মন চায়-
অজান্তিতেই শূন্য দিশায়
        শুধুই দু-হাত বাড়ায়।

যখনই থাকি একলা বসে
     তোমায় মনে পড়ে,
তাই বুঝি দু-নয়ন আমার
       স্বপ্ন - প্রাসাদ গড়ে ।।


               © সুফি রায়












"মৃত্যুমুখী প্রেম" - অনির্বাণ রায়



তুই নেই তাই পুড়ছে সময় দু ঠোঁটের ফাঁকে,
'তুই আসবি' বিশ্বাসের চশমা আটকে রাস্তার বাঁকে।
তুই নেই তাই রক্তেরা শান্ত দীঘির জল
তোর অপেক্ষা আর কত করব বল..।
আমার ঠোঁট মিশেছিল যবে তোর ঠোঁটে...
অনুভূতিরা বন্দী হয়েছিল স্নায়ুদের যানজটে।
যাচ্ছে সময় আর পুড়ছি আমি--
ঠোঁট হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু বাদামি।
মৃত্যুর দিকে ছুটে যায়, সমস্ত প্রেম...
সমস্ত ট্রেন
সমস্ত ড্রেন
সমস্ত প্রেম.. মৃত্যুর দিকে ছুটে যায়।



                               ©  অনির্বাণ রায়

"এমন কেন হয়?" - সুফি রায়



বলতে পারিস, এমন কেন হয়?
এখনো আমার মনটা কেন তোকেই ঘিরে রয়?

যখন তোকে প্রথম দেখি ছাদের চিলেকোঠায়,
বিকেলবেলার রোদ পড়েছে গাছের মাথায় মাথায়।
কীসের টানে হঠাৎ করে
স্বপ্নগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে,
খুলে দিয়ে মনের আগল, ভাসল উজানে।
বলতে পারিস, কোন তুফানে?
আজও আমার মনটা এমন উতল অকারণে।

সেদিন যখন বাড়ির পথে,তোর হাতটা আমার হাতে,
কেমন যেন এক শিহরণ জাগালো আমার বুকের মাঝে।
আজও খোঁজে আমার দুচোখ,
সেই দুটো হাত, নরম আদর---
সেই প্রথম দিনের আলতো ছোঁয়া
আজ যেন সব কালচে ধোঁয়া।
বলতে পারিস, কী ভুল ছিল?
তোর ঠিকানা বদলে গেল. . .

সেদিন যখন ঘুম ভাঙালি
"পথ আলাদা", বলতে এলি---
ভুলে গেলি সেই চেনা গান,
অনেক কথা, মান-অভিমান,
জানলি না তো কোনখানেতে গোপন ব্যথা বাজল,
কিসের ব্যথায় মনটা এমন মোচড় দিয়ে উঠল..।

বলতে পারিস,স্মৃতিগুলো তাড়িয়ে কেন বেড়ায়?
আজও আমার মনটা কেন শুধুই তোকে চায়?

                         
                                            ©  সুফি রায়