মনোজ রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মনোজ রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

" সেদিন " - মনোজ রায়


মনে পরে সেদিনের সেই দিনটি?
যেদিন বসে ছিলাম তুমি আর আমি
করে অধিকার পার্কের সেই কোনটি।

একটানা বৃষ্টি পড়ছিল মুষল ধারায়।
চেয়েছিলাম ভিজতে, কিন্তু পারিনি
তাই এসেছিলাম দুজনে এক ছাতার তলায়।

নিঃশব্দে কাটিয়েছিলাম অনেকটা সময়
একে অপরের দিকে চেয়ে, কি যেন
এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগেছিল অন্তরময়।

হয়তো তুমিও বুঝেছিলে সেই অনুভূতি-
সেদিন কিছুই বলতে পারিনি।
ভয় ছিল মনে, তোমায় হারাই যদি...।

বৃষ্টি থামলে... করছিলে তাড়াহুড়ো
"বাড়ি যেতই হবে, হয়েছে দেরি"
ঘড়িতে তখন বেজেছিলো পাঁচটা বারো।

তুমি গেলে চলে নিজের পথ ধরে;
যেন আরো কিছু সাথে নিয়ে-
ভাবিনি নেবে তুমি আমাকেও আপন করে॥


                                      ©  মনোজ রায়  ©

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

" হঠাৎ দেখা " - মনোজ রায় | সম্পূর্ণ গল্প



— এতো বছর পরেও তুই শুধরালি না, কথায় কথায় রাগ করার স্বভাবটা এখনো রয়ে গেছে তোর। 
— হুমম কিছু কিছু স্বভাব এতো সহজে যায় নাকি? 
— মা হয়ে গেছিস তুই, এখনো সেইরকম আছিস। 
— একদম। তুই কেমন আছিস? 
— যা আছি এই তোর চোখের সামনেই। 

            আজ প্রায় সাত-আট বছর পর হঠাৎ দিল্লী এয়ারপোর্টে আদৃজা আর আদিলের দেখা। একে অপরকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে বসে আছে। তাদের পুনরায় যে দেখা হবে সেটা কখনোই কল্পনা করেনি তারা। অবশ্য এভাবে অবাক হওয়ার কারণও আছে। গত ৮ বছর দুজনে আলাদা জীবন কাটালেও ৮ বছর আগে একে অপরকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারতো না তারা। একে অপরকে খুব ভালো বাসতো যে। বিয়েও করতে চেয়েছিলো তারা। সবকিছু ঠিক ও হয়ে যায়। কিনতু একটি সম্পর্ক তৈরী করাটা যতটা সহজ, সেটা সামলে চলাটা ততটাই কঠিন। 

              সেদিনটা ছিল আদৃজা এবং আদিলের বিয়ের ঠিক আগের দিন। দুজনেই খুব খুশি ছিল, আদৃজা হাতের মেহেন্দির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলো আর মনে মনে হাসছিল। আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপর একে অপরের কাছে আসতে আর কোনো বাধা থাকবে না দুজনের। আদৃজা নিজের হাতের মেহেন্দিটা দেখাবে বলে কল করল আদিলকে। কিন্তু এতো রাতে আদিলের ফোন ব্যাস্ত? কোথায় ব্যাস্ত আদিল? টানা ১৫ মিনিট আদৃজার কল ওয়েটিং থাকার পরও আদিলের কোনো উত্তর নেই। এসব ভাবতে ভাবতে আদৃজার মনে একটা সন্দেহের কাঁটা বিঁধতে লাগল। সাথে সাথে রাগটাও বাড়তে শুরু করে। ৩০ মিনিট ব্যাস্ত থাকার পর আদিল কলব্যাক করলো। 

—হ্যালো.. 
—হ্যালো মানে!! কোথায় ব্যস্ত ছিলিস এতো রাতে? কার সাথে ব্যস্ত ছিলিস? 

প্রচন্ড রেগে গিয়ে একটানা প্রশ্ন করতে শুরু করে দিলো আদৃজা। প্রশ্নগুলো শুনছে ঠিকই কিন্তু উত্তর দেওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না আদিল। আর যখন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ আসলো তখন আর সেটা আদৃজার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হল না। 

— "আগে থেকেই তোর উপর সন্দেহ ছিল। এখন আমি নিশ্চিত, তাই আমাদের বিয়ে ভুলে যা। যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকিস তাহলে বাড়িতে বলে দিস যে এই বিয়ে করছিস না। যদি আসিস তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি।" 

শেষ কথাটা বলেই কলটা কেটে দিয়েছিলো আদৃজা। এরকম একটা ছোট্ট কথার জন্য সম্পর্ক নষ্ট? এটা সম্ভব? আদিল জানে আদৃজা কথায় কথায় খুব রেগে যায়। কিন্তু সেই রাগের জন্য কী বিয়ে ভাঙা যায়? আদিল বুঝতে পারলো না কি করবে। অনেকবার কল করার চেষ্টা করল আদৃজাকে। কিন্তু প্রতিবারই ওর কলটা কেটে দিচ্ছিল আদৃজা। এরকম কিছুক্ষণ চলার পর একটি মেসেজ এলো, অদৃজার। তাতে লেখা ছিল, "আর কোনোদিন যোগাযোগ করবিনা, তাহলে আমাকে আর কেউই দেখতে পাবে না কোনোদিনও।" 

           এরপর আদিলের আর সাহস হলো না আদৃজাকে যোগাযোগ করার। কারণ সে জানতো আদৃজা সেটা করে যেটা সে বলে। কিনতু এত সহজে তাদের সম্পর্কের ভাঙ্গন মেনে নিতে পারলো না আদিল। যদি আদৃজা একবার শুনতো ওর কথা, যদি আদৃজা একবার ওকে বিশ্বাস করত যে বিয়ের আগের রাতে নেহাতই ওর কিছু বন্ধুদের সাথে হাসি-মজা করছিল... এরকম অনেক যদি-র নিচে চাপা পড়ে গেছিল ওর মনের কান্না। কিনতু সেই মুহূর্তে সুইসাইডের হুমকি দেওয়া একগুঁয়ে আদৃজার থেকে দূরে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আদিলের কাছে। এরপর আদিল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, আর থাকতে চায়নি এখানে। পুরোনো স্মৃতি ভুলতে কিছুদিনের মধ্যেই রওনা হলো আমেরিকা। আদিল আগেই ওখানে জব অফার পেয়েছিলো। কথা ছিলো বিয়ের পর আদৃজাকে নিয়েই বিদেশ পাড়ি দেবে, কিনতু তখন আদৃজাকে ভুলে থাকতে দেশ ছেড়েছিল। 

একটা বাচ্চার আওয়াজে চমক ভাঙল আদিলের। জিজ্ঞাসা করল, "কোথা থেকে ফিরছিস?" 

— আমি তো দিল্লি থেকেই কলকাতা যাচ্ছি। তুই ? 
— যেখানে গিয়েছিলাম সব ছেড়ে সেখান থেকে ফিরছি, আমেরিকা থেকে। আজ ৮ বছর পর। দিল্লিতে নেমে আবার কলকাতার ফ্লাইট। কিন্তু এই পুচকেটা কে? 
— আমার ছেলে দুদিন পর ওর জন্মদিন, তাই কলকাতা ফিরছি। 
— তার মানে তুই দিল্লীতেই থাকিস? তা তোর হাজব্যান্ড কোথায়? 
আদৃজা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। 
— কী হলো? চুপ করে গেলি যে!! 

আদৃজা তবু চুপ করেই রইল। শুধু আদিল দেখল আদৃজার চোখের কোণ বেয়ে জল পড়তে লাগল। তারপর খেয়াল করলো আদৃজার হাতে শাখা-নোয়া বা মাথায় সিঁদুর নেই। 

"মানে ........" কিছু বলতেই যাচ্ছিল আদিল। হঠাৎ ওকে থামিয়ে আদৃজা বলে উঠল, 

— আমাদের সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পর তুই চলে যাস। তার কিছুদিন পর আমি খুঁজেছিলাম তোকে কিন্তু ততদিনে তুই চলে গেছিস। কোথায় গেছিস তোর বাড়ির কেউ বলেনি আমাকে। তারপর বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দেয় দিল্লির একজন ব্যাবসায়ীর সাথে। বছর দুই আগে একটি কার একসিডেন্টে মারা যায় আমার হাজব্যান্ড। তারপর থেকে ব্যবসা, সংসার,ছেলে সব আমাকেই সামলাতে হয়। 

— আমার আদৃজার ওপর দিয়ে যে এত ঝড় বয়ে গেছে সেটা ভাবতেও পারছি না। যেমন সেদিন ওরকম একটা ছোট্ট কারণে আমাদের সম্পর্কটাকে ভেঙে ফেলবি সেটাও কখনো কল্পনা করিনি। সেদিন আমি ফোনে ব্যাস্ত ছিলাম ঠিকই, কিনতু আমার এক বন্ধু নিজেদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া নিয়ে সুসাইড করতে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে ওকে বোঝানোটাই সবচেয়ে বেশি গুরুতূপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল আমার। তখন মনে মনে নিজেকে খুব লাকি মনে হচ্ছিল আমার, যে আমাদের মধ্যে ঝগড়া হলেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। কারণ আমার কাছে তুই আছিস। কিন্তু তুই তো আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিলি না। একবার ভাবলিও না যে এভাবে সম্পর্ক ভাঙ্গলে আমার কী হবে। 

— তোকে বলার সুযোগ দিলেও সম্পর্কটা আমাদের ভাঙতোই রে। আর তখন যে আমি নিজেকে.... 

— মানে ? 

"প্লিজ গিভ ইওর কাইন্ড অ্যাটেনশন, ফ্লাইট উইল ল্যান্ড উইদিন ফাইভ মিনিটস, কাইন্ডলি চেক ইওর সিটবেল্ট" 

— মনে, আমার নাম আদৃজা মুখার্জী আর তোর নাম মোহাম্মদ আদিল শেখ। আমার বাড়িতে একটানা অস্বীকার করার পর হঠাৎ আমাদের সম্পর্কটা সবাই মেনে নিয়েছিল ভালোভাবেই। তাতে একটু অবাক হয়েছিলাম প্রথমে কিন্তু পরে ভেবেছিলাম সত্যিই মেনে নিয়েছে। তখন তো বুঝিনি তোকে মেনে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল তোকে খুন করা আর তোর নামে মিথ্যে বদনাম দিয়ে আমার মন থেকে তোকে সরিয়ে ফেলা। 

আদিল বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রয়েছে আদৃজার দিকে। আদৃজা বলে চলেছে, "সেদিন হাতে মেহেন্দি লাগিয়ে খুব খুশি ছিলাম আমি। দৌড়ে ছাদে যাচ্ছিলাম তোকে মেহেন্দির ছবি দেখাবো বলে। হঠাৎ বাবার ঘর থেকে কয়েকজনের চাপা কথার আওয়াজ শুনতে পেলাম। কোনো প্রবলেম হয়েছে ভেবে ঘরে ঢুকতে গিয়ে বুঝলাম দরজা বন্ধ। তখনই সব শুনেছিলাম। তখনই তোকে কল করছিলাম। কিনতু তুই ব্যস্ত ছিলিস। আর সেই সুযোগটাকেই আমি কাজে লাগালাম। কারণ সত্যি কথা বললেও হয়ত তুই আমাকেবিয়ে করতে চলেই আসতিস। ভেবেছিলাম কিছুদিন পর বাড়ি থেকে লুকিয়ে তোর কাছে যাব। কিনতু ততদিনে তো তুই চলে গেছিস। 

          আদিল তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত। সেদিনের পর থেকে ও আদৃজার ওপর কত রাগ করেছে, বিরক্ত হয়েছে। শেষের দিকে নিজের সমস্ত দুঃখের জন্য আদৃজাকেই দায়ী করেছে আর ওকে অ্যাভয়েড করে ভুলতে চেয়েছে। আজকে দুজনের দেখা হওয়ার একটু আগে অবধি আদিল ভাবত আদৃজা ওর লাইফটা শেষ করে দিয়েছে। কিনতু আদৃজা তো ওকে পুরো জীবনটাই দান করে গেল। এতদিন ও শুধু নিজের পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব কষত। কিনতু আজ জানলো আদৃজা পুরোটাই ওকে দিয়ে গেছে, বদলে চায়নি কিছুই। 

— এক্সকিউজ মি স্যার ...ফ্লাইট ল্যান্ড করে গেছে। 

এয়ার হোস্টেসের ডাক শুনে ঘোর কাটল আদিলের। দেখলো পাশে আদৃজা নেই... সবাই বেরিয়ে গেছে। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ডাকল, "আদৃজাআআ....!!!" আদৃজা ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসতে হাসতে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো আদিলকে। আদিলও দূর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। এখন আর ওর মনে কোনো খারাপ লাগা নেই। কারণ ও জানে আদৃজাকে জীবনে না পেলেও আদৃজার অদৃশ্য ভালোবাসা ওকে আজও আগলে রেখেছে।


                                                ©  মনোজ রায় ©

বুধবার, ২ অক্টোবর, ২০১৯

সত্যের চাবিকাঠি - সম্পূর্ণ গল্প

পত্রিকার জন্মদিনে পত্রিকার তরফ থেকে আপনাদের জন্য রইল রিটার্ন গিফ্ট। একটি সম্পূর্ণ গোয়েন্দা কাহিনী একটি ফাইলে।



শ্যামবাজারের অবস্থাপন্ন বনেদী বাড়িতে তপন কুমার দে নামে ভাড়াটিয়া খুন। পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে তপন কুমার দে দু'বছর আগেই মারা গেছেন। তবে খুন হওয়া এই ব্যক্তি কে? এমনকি তার স্ত্রী পরিচয়ে থাকা, খুনের পরে পলাতক মহিলাও তার আসল স্ত্রী নন। এদিকে বাড়িওয়ালা সুকুমার সেন পুলিশি জেরায় জেরবার। প্রশ্ন অনেক। খুনি কে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন ভিক্টিম কে? সে কেন অন্য লোকের পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল? খুন হওয়া ব্যক্তি কি নিজে অপরাধী? নাকি অপরাধের শিকার? উত্তর খুঁজতে হলে সঙ্গী হতে হবে সত্যের অভিযানের। সঙ্গে থাকুক "সত্যের চাবিকাঠি"।



সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

" এক শীতের সকাল " - মনোজ রায়


        "কিগো  শুনছো..!! কত বেলা হয়ে গেল  তো। এবার  ওঠো।"

        আমি পাশ ফিরে চাদরটা মুড়ি দিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ মাথায় এলো আজকে অফিসে বস কে রিপোর্টটা জমা দিতে হবে। কাজটা কালকে বস আমাকে দিয়েছিলো। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। ঘড়িতে  তখন ৮:১৫ বাজে। অর্পিকে ডেকে বললাম, "জলটা গরম করে দাও তো তাড়াতাড়ি"।

        অর্পিতা, আমার বউ। ভালোবেসে অর্পি বলে ডাকি।

        স্নান সেরে এসে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। ওদিকে অর্পি ব্রেকফাস্ট টেবিল  সাজাচ্ছে। অফিসের কাগজ-পত্রগুলো আমার টেবিলেই রয়ে গেছে। রাতে  কাজ করতে করতে আর গুছিয়ে রাখা হয়নি।

        "উফফফ...!! পেপারগুলো যে আটকাবো, একটা পেপার ক্লিপও পাচ্ছিনা।" টেবিলে, ড্রয়ারে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিলাম। এদিকে ৯টা বেজে গেছে। ৯:২৫ এর বাসটা ধরতেই হবে। শেষমেষ একটা পেপার পিন খুঁজে পেলাম। কাগজগুলোকে আটকে ফাইলে ভরে নিলাম। ড্রয়ারটা বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়লো  ড্রয়ারের ভেতরে শেষ  প্রান্তে.. একটি  গোলাপি  রঙের  কাগজ। অনেকদিন পড়ে থেকে কেমন যেন ধূসর হয়ে এসেছে। কাগজটি  হাতে  নিয়ে  খুলতেই ... 
         "তোমাকে পাওয়া আমার ভাগ্যে নেই, 
কিন্তু তুমি আমার হৃদয়ে চিরদিনের মতো বাসা করে নিয়েছো। 
অনেক কিছু না বলা রয়ে গেল। ভালো থেকো  ....সুখে  থেকো ...।

                                          --- তোমার কাছের বন্ধু 
                                                     অনিতা "

        পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলাম ৭ বছর আগের কলেজ লাইফে। কলেজের প্রথম দিন ...,অটো থেকে নেমে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে কলেজের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম| তারপর গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, "দাদা ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসটা কোথায় বলতে পারবে?" 
---কোন রুমে বলতে পারছিনা তবে দোতলাতে হয়।"
---আচ্ছা ঠিক আছে, ধন্যবাদ।"

আমি দোতালার দিকে এগোতে লাগলাম। হঠাৎ পেছন থেকে শুনতে পেলাম..
---"এই  যে  কি  হচ্ছে  এসব?" 
ঘুরে দেখি একটি মেয়ে। আমি কিছু বলার আগেই আমার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি হলো। কিছুক্ষণ পর ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম যখন মেয়েটি বললো,
---"আমি তোমাকে চিনিনা জানিনা; তোমার সাহস কি করে হলো আমাকে চিঠি  দেওয়ার? এরপর যদি এরকম করেছো তো সোজা জেলের হাওয়া খাইয়ে দেব।"
এই বলে সে সেখান থেকে চলে গেলো। আমি কিছু বলার সুযোগ ও পেলাম না।

       যাই হোক, কোনো রকমে ক্লাসরুমটা খুঁজে পেলাম। রুমে ঢুকতেই দেখি সেই মেয়েটি বাঁদিকের দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে পাশের বান্ধবীর সাথে কথা বলছে। তখন আমাকে লক্ষ্য করেনি, আমিও আর  কিছু বলতে যাইনি। চুপচাপ ডানদিকের তৃতীয় বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ করে ওর নজর পড়লো আমার দিকে। ওর চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন আবার আমাকে মারতে চাইছে। ক্লাস  শেষে আমি নিজের মত বেরিয়ে গেলাম।

        পরের দিন আমি আবার ডান দিকের তৃতীয় বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ দেখি মেয়েটি আমার পাশে এসে বসলো।
---"সরি  !!! আসলে আমি অন্য একজনকে ভেবে তোমাকে চড় মেরে ফেলেছি..,I  am  very sorry। কিন্তু তুমি আমাকে কিছু বললে না কেন কালকে?"
---"আমার প্রথম দিন ছিল কালকে। আর যখন চড় মারলে আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ভেবেছিলাম দুটো কথা শোনাবো। তারপর ভাবলাম, প্রথমদিন ঝামেলা করা ঠিক হবেনা। তাই আর  ...."

        এরপর আস্তে আস্তে আমাদের কথা বলা শুরু হয়ে গেলো। আমরা অনেক কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। বুঝতেই পারিনি যে কখন ও আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে।

        আমরা একটা ফিল্ম দেখার প্ল্যান করেছি। মনে মনে বেশ এক্সাইটেড ছিলামি। রোজকার মতো ডানদিকের তৃতীয় বেঞ্চে বসে ওর অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু সেদিন ও এলো না।ক্লাসে বসে শুধু ওর কথাই ভাবছিলাম। ক্লাস শেষে ওকে অনেকবার কল করার চেষ্টা করলাম কিন্তু কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারলাম না।

        টানা দুদিন ওর কোনো খোঁজ পেলাম না। এরপর একদিন ক্লাসে বসে ওর কথা ভাবতে ভাবতে বুঝতেই পারিনি কখন ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। সকলেই চলে গেছে। বুঝতে পারছিলাম না কি হল। হঠাৎ  ওর এক বান্ধবী আমার কাছে এসে বললো.., "এই চিঠিটা তোমার জন্য..  অনিতা দিয়েছে।"
আর কিছু না ভেবেই আমি কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগলাম--

        "তোমাকে পাওয়া আমার ভাগ্যে নেই ..... ... ..।"

        চোখের জল আর আটকে রাখতে পারিনি। হঠাৎ ডাক পড়লো..
---"কি গো, ব্রেকফাস্ট রেডি হয়ে গেছে তো। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে যে..।" কোনোরকমে চোখের জল মুছে ঘড়ির দিকে তাকালাম....  ৯:১০ বাজে। চিঠিটা আবার ড্রয়ারে রেখে ব্রেকফাস্ট টেবিলে ছুট লাগালাম।

সত্যি .... অনেক কিছু না বলা রয়ে গেল!!

© মনোজ রায়

সোমবার, ১০ জুলাই, ২০১৭

" GREETINGS CARD " - মনোজ রায়



দেখতে দেখতে বিদায় নিতে চলেছে আরো একটা বছর ,২০১৬। সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ২০১৭ দরজায় উঁকি মারছে। ৩১ শে ডিসেম্বর থেকেই হু হু করে চড়তে থাকে উন্মাদনার পারদ। বছরের শেষ রাতে ঝলমলে আলোর মাঝেই শুরু হয় নতুন বছর শুরুর অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটাও যেন ধীরে চলতে থাকে, বাড়িয়ে দেয় অপেক্ষার অধীরতা। কারণ একটি সেকেণ্ডে সময়ের ব্যাবধান হয়ে দাঁড়ায় পুরো একটা বছর। আর নতুন বছর মানেই সকলে মিলে আড্ডা ,গল্প, পিকনিক। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্রিটিংস কার্ডের মাধ্যমে নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তা আদান প্রদান। নার্সারি পড়ুয়া থেকে শুরু করে বয়স্ক- সবাই তাদের আপনজন, আত্মীয়-বন্ধুদের গ্রিটিংস কার্ড দিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানায়।

        Greetings Card এর প্রচলন শুরু হয় প্রাচীন চীন দেশে। তখন তারা নিজেদের সদিচ্ছাগুলি একে অপরের সাথে আদানপ্রদান করতো নতুন বছর উদযাপন করার সময়। মিশরীয়রা শুভেচ্ছা আদানপ্রদান করতো প্যাপিরাসের উপর। জার্মানরা পরিচিত ছিল ১৪ শতকের দিকে কাঠের টুকরোর উপর এঁকে শুভেচ্ছা আদানপ্রদান এর জন্য। ১৫ শতকের প্রথম দিকে হাতে বানানো কাগজের Greetings Cardব্যবহার করতো ইউরোপীয়রা। সবথেকে পুরোনো ভ্যালেনটাইন বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে। ১৮৫০ এর দিকে হাতে তৈরী Greetings Card অনেক বেশি দামি এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে অনেকেই গ্রিটিংস কার্ড ছাপার আকারে বাজারে আনতে উদ্যোগী হয়।

        নববর্ষ ছাড়া Greetings Card অন্যান্য অনুষ্ঠানেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন- জন্মদিন, বিয়ে অথবা বিবাহবার্ষিকী, শিক্ষক দিবস, ক্রিসমাস ইত্যাদি। Greetings Card দোকানে কিনতে পাওয়া গেলেও অনেকেই নিজের হাতে বানিয়ে দিতে পছন্দ করে। কিনতু বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া (হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইমো ইত্যাদি) এবং ইলেকট্রনিক মেসেজিং সার্ভিসগুলোর কারণে


Greetings Card এর ব্যবহার কমে এসেছে। ভেবে আশ্চর্য বোধ হয় রে, আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত Greetings Card ব্যবহার কমলেও প্রাশ্চাত্য দেশগুলিতে এর ব্যবহার এখনো আছে। পাশ্চাত্য দেশগুলি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সময়ের নিরীখে আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। তা সত্ত্বেও সেখানে গ্রিটিংস কার্ডের চল রয়েছে, বিশেষ করে এই ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে। আসলে সময়ের সাথে সাথে মানুষ যত আধুনিক হয়েছে ততই কমে গেছে সামাজিকতার আন্তরিকতা। তাই এখন আর বছর শেষে দোকানে মানুষের ভিড় দেখা যায় না। দোকানের বাইরেও ঝুলতে দেখা যায় না ছোট-বড় রং-বেরঙের কার্ড। যদিও এখনও সবাই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়। তবে তা হাতে হাতে উষ্ণ অনুভূতি নয়, তা অসাড় মুঠোফোনের শীতল সামাজিকতা। 



                                                                            - মনোজ রায়

" রিমির মৃত্যু রহস্য - দ্বিতীয় অংশ " - মনোজ রায়



      অদিতি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "এরকম কেন বলছেন? ও তো আমার সাথেই এলো। কত গল্প করলাম আমরা। একসাথে খেলাম। তারপর ও নিজেই বললো হোস্টেলে আসতে, আপনার সাথে দেখা করে... "
— "অদিতি মৃত মানুষ কখনো ফিরে আসেনা।"


অদিতি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মিসেস রায়-এর দিকে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
— "মৃত মানুষ?? আমার রিমি বেঁচে আছে। আমার সাথেই ছিল সারাদিন। আজ ওর জন্মদিন আর আজকের দিনে আপনি এরকম কী করে বলতে পারেন?"
— "মিসেস ব্যানার্জী, আপনি আমার ঘরে চলুন। আমি আপনাকে সব বলছি।"
দুজনেই ঘরে এসে বসলেন। একটু সময় নিয়ে ইন-চার্জ বললেন, "রিমি দুমাস আগেই মারা গেছে। হোস্টেলেই। স্যুইসাইড।"
এবার আর অদিতির চোখের জল বাঁধা মানল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। অদিতির মনে হচ্ছে যেন এবার ও সত্যি সত্যি বোনকে হারিয়ে ফেলল। এতদিন কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও ওর মনে একটা আশা ছিল হয়ত রিমি ফিরে আসবে। কিন্তু আজকে এই কথা শোনার পর অদিতি বুঝে গেছে যে রিমি আর কোনদিন ফিরবে না। এটা যেন ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। মিসেস রায় নেজের চেয়ার ছেড়ে এসে ওকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন।

অদিতি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, "কি হয়েছিল? বলুন আমাকে।" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস রায় বলতে শুরু করলেন- "সেদিন ছিল রবিবার। কলেজে

তিনদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছিল। তাই অনেকেই শনিবার রাতে বা রবিবার সকালে বাড়ি চলে গিয়েছিল। রিমিকে নিয়ে নয়জন মতো ছিল হোস্টেলে। তখন রাত প্রায় দশটা। আমি ঘরেই ছিলাম। এমন সময় একজনের চিৎকার শুনলাম। জানলা খুলে বাইরে কিছু দেখতে পেলাম না। কিছুক্ষণ পরে সাত-আটজন মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এলো আমার ঘরে।"
— "ম্যাডাম রিমি...!!"
— "কি হয়েছে রিমির?"
— "আমরা সবাই খাওয়ার পরে ছাদে বসে গল্প করছিলাম। রিমিও ছিল আমাদের সাথে। এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ছাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে দিলো। আমরা খুব ঘাবড়ে গেলাম। কিছু না বুঝতে পেরে আপনার কাছে এলাম। আমাদের খুব ভয় লাগছে।
— "সে কি..!! কী সব বলছো তোমরা? কোথায় ঝাঁপ দিলো? কেন? আমাকে দেখাও.. চল তোমরা।"
— "সেখানেই পড়ে আছে ম্যাডাম। আমরা কিছু করিনি।"
— "আচ্ছা চল, আগে রিমিকে দেখি।"
এই বলে মিসেস রায় একটু থামলেন। অদিতির চোখ থেকে সমানে জল গড়িয়ে পড়ছে তখনো। জিজ্ঞেস করল, "তারপর??"
— "আমি সবার সাথে গেলাম সেখানে। কাছে গিয়ে দেখলাম রিমি আর নেই। রিমি খুব ভালো মেয়ে ছিল। এভাবে ছেড়ে তো দেওয়া যায়না। তাই তাড়াতাড়ি কলেজ ট্রাস্টি কে কল করে সব কিছু জানালাম। মিঃ সেন বিরক্ত হয়ে বললেন, 'এটা যেন কোনো ভাবেই জানাজানি না হয়। কোনভাবেই যেন কলেজের বদনাম না হয়। তুমি আপাতত স্টুডেন্টদের হ্যাণ্ডেল করো। আমি দেখছি।' এই বলে উনি কলটা কেটে দিলেন। রিমির জন্য খারাপ লাগলেও ওপরমহলের কাছে আমার হাত-পা বাঁধা ছিল। সেদিন ওনার নির্দেশ মতোই সবাইকে জানানো হয়েছিল যে রিমিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"

 "কিন্তু আমার বোন সুইসাইড করেছে এটা আমি কোনোমতেই মানতে পারবনা। ও খুব সাহসী। কিছু নিশ্চয়ই লুকোচ্ছেন আমার কাছে। নইলে হোস্টেলেই লুকিয়ে আছে ওর সুইসাইড করার কারণ।"

এটা শুনে মিসেস রায় ঘাবড়ে গেলেন, "আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে
পারছি। কিন্তু যা হয়েছে তাতে আমাদের কোন দোষ ছিল না। তাছাড়া রিমি তো ফিরে আসবে না। আর আপনি যদি পুলিশে কমপ্লেইন করেন আমার যা হয় হবে। কিনতু সাথে ওই সাত-আটজন মেয়ের লাইফও নষ্ট হয়ে যাবে। প্লিজ এরকম কিছু...."
মিসেস রায়ের কথা শেষ হতে পারল না। তার আগেই একটা তীক্ষ্ন চীৎকারে বুক কেঁপে উঠল। শব্দের আকস্মিকতায় সকলেই স্তম্ভিত। তারপর দুজনেই ছুটলেন আওয়াজ লক্ষ্য করে, হোস্টেলের দিকে।
করিডোরে অনেক মেয়ে জটলা করে আছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল একটা মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার মুখে-চোখে জলের ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হয়েছে। কিন্তু সে অঝোরে কেঁদে চলেছে। তার হাত-পা কাঁপছে, আর বারবার রিমির নাম নিচ্ছে। এবার মিসেস রায় যেন হঠাৎ করে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন তাকে নিয়ে, "কিছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে যাবে" বলে কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু অদিতির একটু অবাক লাগল। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, "কী হয়েছে? বারবার রিমির নাম করছ কেন?"
তখন মেয়েটি যা বলল তাতে সকলেরই গায়ে কাঁটা দিল, "রিমি.. রিমি এসেছিল। ওখানে দাঁড়িয়েছিল।


                                                  
                                                                          (........শেষ অংশ )

                                                                           - মনোজ রায়

" বড় দিনের উপহার - দ্বিতীয় অংশ " - মনোজ রায়



রবিনের ছোটবেলার ইচ্ছের কথা শুনে সত্যিই সবাই অবাক হয়ে গেল। প্রায় একসাথেই জিজ্ঞাসা করল সবাই, "মানে?"
রবিন : "ছোট বেলায় টিভিতে ওই প্যালেসটা বারবার দেখাতো এক্সিবিশনের সময়ে। তখন ওই প্যালেসটা দেখতাম আর  বাবাকে বলতাম,"বাবা একদিন ওই বাড়িটা আমার হবে আর তুমি ওখানে রাজা হবে।" বাবা হাসতো আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতো, "বোকা ছেলে!! ওটা রাজাদের মহল। কোথায় ওরা রাজা আর কোথায় আমরা সাধারণ মানুষ। ওসব শুধু স্বপ্নতেই হতে পারে।"


নীল : "আরে..!! হতেই তো পারে এটা জাস্ট একটা কো-ইন্সিডেন্স। সত্যিই কেউ মজা করেছে আর কোনক্রমে ব্যাপারটা মিলে গেছে। নাহলে কোথায় অজিত সিংহ আর তুই কোথাকার রবিন.., তোর নামে এতো বড় একটা প্যালেস লিখে দেবে?"
মানালি : "শোন না!! গুগল এ একবার সার্চ করে দেখ না অজিত সিংহের নামে কিছু পাওয়া যায় কিনা।"
নীল : " হুমম স্মিতা একদম ঠিক বলেছে ,একবার সার্চ করে দেখ তো কিছু দেখায় কিনা।
রবিন টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা অন করলো। গুগল সার্চ এ টাইপ করলো- "information about maharaja Ajit Singh , hajigarh" সেকেন্ডের মধ্যে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা তথ্য- " Today  morning (25 .12 .
2015 ), at 9.30 a.m, the  famous writer and painter Maharaja Ajit Singh has died. As he was the last person of Raja Bikram
Singh family, he has written all his property to an unknown

person before his death. No one know about that person except his advocate till now."
এটা দেখা মাত্র রবিনের হৃদস্পন্দনের বেগ  যেন আরো বেড়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে দলিলটা হাতে নিয়ে দেখল তাতে অজিত সিংহের সই রয়েছে। আর নিচে লেখা তারিখটা ২৫/১২/২০১৬। এখন রবিনের মনে ভিড় করে এসেছে অনেক প্রশ্ন। সকলে মিলেও এই প্রশ্নের কোন সমাধান সূত্র খুঁজে পেল না। আনন্দ উল্লাসের সাথে পার্টিটা শুরু হলেও মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন নিয়েই সকলে রবিনের কাছ থেকে বিদায় নিলো। শুধু অরূপ বলল,"উইলটা ১০০% আসল। তবে তুই এনিয়ে বেশি চিন্তা করিস না। আমি একবার দেখব না হয় উইলটার ব্যাপারে খোঁজখবর করে।"

        অরূপ হাইকোর্টে চাকরি করে। তাই হয়ত এই আশ্বাসবাণী। কিন্তু রবিন কোনোভাবেই এই প্রশ্নগুলো থেকে নিজের মনকে আলাদা করতে পারছিলোনা। সেইসঙ্গে ওই চিঠির কথাগুলো রবিনকে ঘুমাতে দিচ্ছিল না। পরদিন সকালেও রবিন কাজে মন বসাতে পারল না। আগামীকাল একটা জরুরী কাজ আছে। কিনতু এই ধাঁধাঁর উত্তর খুঁজে না পাওয়া অবধি তার মনের অস্থিরতা কাটবে না। তাই আজকেই হাজিগড় যাবে ঠিক করল। কলকাতা থেকে হাজিগড় যেতে মোটামুটি দু-আড়াই ঘন্টা মত লাগে গাড়িতে। এখন বেরিয়ে পড়লে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসতে পারবে। তারপরে কালকের কাজগুলো সারতে হবে। তাই আগে কিছু জরুরী ফোনকল করে নিল। তারপর রওনা হলো হাজিগড়ের উদ্দেশ্যে।

        হাজিগড় যেতে মোটামুটি দুটো জাতীয় সড়ক ক্রস করতে হয়- ১১৭নং আর ৬নং| তাই যানজটের ঝক্কি তেমন নেই। তাছাড়া, অঞ্চলটা একটু সবুজে ঘেরা। তারওপর আবার গন্তব্য রাজবাড়ি। মোটকথা, যাত্রার এই সময়টা মন্দ কাটল না ওর। হাজিগড় স্টেশনর কাছে এসে একজনকে জিজ্ঞাসা করে নিল প্যালেসে যাওয়ার রাস্তাটা। স্টেশান থেকে এই.. দু-মিনিট মত গিয়ে একটা বিরাট গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। গেটের দুপাশে দুটি সাদা মার্বেলের হাতি। আর দুজন সশস্ত্র দারোয়ান। রবিনের গাড়ি এসে দাঁড়াতেই একজন বেরিয়ে এসে রীতিমত জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে
দিল-- "কী করেন","কোথায় থাকেন","কেন এসেছেন" আরো কত কী। কিন্তু যেইমাত্র শুনল যে রবিন প্রপার্টির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছে,তৎক্ষণাৎ ওর ভেতরে প্রবেশ
নিষিদ্ধ হয়ে গেল। আসলে প্রপার্টি নিয়ে অজিত সিংহের এরকম একটা সিদ্ধান্তের জন্যই হয়ত এত কড়াকড়ি। তাই অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনোভাবেই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেলোনা রবিন। অনেকরকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শুরু হল চিৎকার চেঁচামেচি। এর মধ্যেই একজন কাউকে যেন ফোন করল। একটু পরে একজন বয়স্কলোক বেরিয়ে এলেন।
--- "নমস্কার! আমি রাজবাড়ির দেওয়ান। কী প্রয়োজন বলুন।"
--- "আমি শুনলাম যে রাজাবাবু তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কোন একজন অজ্ঞাত ব্যাক্তিকে দান করে গেছেন। একথা কী সত্যি?"
রবিনের মুখে একথা শুনে দেওয়ান জীর চোয়াল একটু শক্ত হয়ে গেল। বললেন, "কোন অজানা অচেনা ব্যাক্তির সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করা চলে না। এটা অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়।"
---"জানি। কিন্তু কাল রাতে এটা আমি পেয়েছি", বলে রবিন ব্রিফকেস থেকে উইলটা বের করে দিল। দেওয়ানজী সেটা হাতে নিয়ে দেখে বুঝলেন উইলটা আসল। তখন রবিনকে ভেতরে আসতে বললেন। রবিন গাড়িটা গেটের বাইরেই পার্ক করে দেওয়ানজীর পিছু পিছু চলল। গেট দিয়ে ঢুকেই মোরাম বিছানো রাস্তা। দুপাশে সাজানো বাগান। মূল প্রাসাদের সামনে একটা ফোয়ারা। সেখানকার স্বচ্ছ জলে আধফোঁটা পদ্মরাশির মাঝখানে এক অর্ধনগ্ন এলোকেশীর প্রস্তরমূর্তি। মূর্তির চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। মনে হয় যেন এই অষ্টাদশীর সৌন্দর্য আস্বাদনের জন্য সময় তার স্নানের মুহূর্তটিতেই স্থির হয়ে গেছে। ফোয়ারার পরে গাড়িবারান্দা। সেখানে খানচারেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়িবারান্দা পেরিয়ে ওরা ঢুকল একটা বড় হলঘরে। হলঘরের ভেতর দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দুদিকে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে একটা কোণের দিকের ঘরে গিয়ে ঢুকল দুজন। এটা একটা অফিস ঘরের মত। চারিদিকে থরে থরে কাগজপত্র রাখা। একপাশে গদি-আঁটা চৌকির ওপর একটা নীচু টেবিল। অন্যপাশে গুটিকতক গদি-আঁটা চেয়ার।

দেওয়ানজী আমাকে সেখানে বসতে বললেন। তারপর কথা শুরু করলেন, "গোড়া থেকে আমাকে ঘটনাটা খুলে বলুন তো।"
সেদিন রাতে যা যা হয়েছিল সবকিছু খুলে বলল রবিন। সেইসঙ্গে ওই চিঠিটার কথাও বলল। সব শুনে দেওয়ানজী বললেন, "কিন্তু আপনি যে সত্যিকথা বলছেন তার কী
প্রমাণ আছে?"

রবিন একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলল,"দেখুন, আমার এই
প্রপার্টির ওপর কোন লোভ নেই। আপনি যদি ওই চিঠিটার কথা বলেন, তবে বলব ছোটবেলায় এরকম দু-একটা অদ্ভুত ইচ্ছা সকলেরই থাকে। সেটাকে সত্যি ভেবে

নেওয়ার কোন মানে হয়না। যদিও ওই চিঠিটা আমাকেও অবাক করেছে, কারণ তাতে লেখা কথাগুলো সত্যি। আর আপনি যদি এটা বলতে চান যে এটা জাল উইল তবে বলব, সেটা হতেই পারে। কারণ আমাকে কেউ নিজে হাতে করে এটা দেয়নি। তবে এবিষয়ে আমার ওপর সন্দেহ করা অমূলক। কারণ রাজাবাবু কাল সকালেই মারা গেছেন। সেই খবর শোনার পর একবেলার মধ্যে নিশ্চই আমার পক্ষে জাল উইল তৈরী করা সম্ভব নয়।"
---"হমমম..!!
--- "আর তাতেও আপনার সন্দেহ না কাটলে আপনি নিজে এই উইলটা যাচাই করে নিতে পারেন কিংবা এই চিঠি" এই বলে রবিন চিঠিটা বের করে দেওয়ানের হাতে দিল। তারপর বলল,"আচ্ছা.. ওই চিঠির লেখাটা কী রাজাবাবুর হাতের লেখা বলে মনে হয় আপনার?"
---"হ্যাঁ।"
---"কিন্তু..."
---"তোমার নাম কী?"
---"রবিন.. রবিন ডি'সুজা।"
---"তোমার বাবার নাম?"
---"আর্ভিন ডি'সুজা।"

রবিন লক্ষ্য করল তার বাবার নাম শুনে দেওয়ানজী যেন চমকে উঠলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,"তোমার মা কী সারা?"
দেওয়ানের কথা শুনে রবিন অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল,"আপনি আমার মাকে চেনেন?"
---"এই উইল রাজাবাবু তোমাকেই পাঠিয়েছেন রবিন। এখন এই প্যালেসের একমাত্র উত্তরাধিকারী তুমি।"
                                                            
                                                        (........পরবর্তী অংশ  )


                                                                      - মনোজ রায়

" বড় দিনের উপহার - প্রথম অংশ" - মনোজ রায়

আজ ২৫ শে ডিসেম্বর,মানে বড়দিন।
রবিন তার পাঁচজন বন্ধুদের বাড়িতে ইনভাইট করেছে। এবছর সকলে মিলে অন্য কোথাও গিয়ে সেলিব্রেট করার প্ল্যান ছিল। কিন্তু রবিন আজকের দিনটা বাড়িতেই কাটাতে চায়। রনি, স্মিতা, অরূপ, নীল, মানালি- এই পাঁচজন রবিনের খুব ভালো বন্ধু। সেই স্কুল লাইফ থেকেই।  একসাথেই স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পার করেছে। বর্তমানে রনি আর স্মিতা চাকরি করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে, একসাথে। নীল আর মানালি একটা IT  কোম্পানিতে চাকরি করছে। একমাত্র অরূপই একটা সরকারী চাকরি করছে- হাইকোর্টে, ক্লার্ক। আর রবিন তার পারিবারিক বাবসাটাকে আরো উঁচু একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। বাবা-মা দুবছর আগেই একটি দুর্ঘটনাতে মারা যায়। পরিজন বলতে এক কাকু, পরিবারের সাথে আমেরিকাতে থাকে। ওই ফোনে মাঝে সাঝে কথা হয়; বারবার বলে আমেরিকা চলে যেতে। কিন্তু রবিন তার পরিবারের এই স্মৃতিগুলোকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায়না। একাই থাকে বাড়িতে। কখনো কখনো সব বন্ধুরা একসাথে মিলে পার্টি, গেট টুগেদার হয়। এদেরকে পেয়ে নিজেকে কখনো একা অনুভব করে না রবিন।

        রবিনের পুরো নাম রবিন ডিসুজা, অর্থাৎ খ্রিস্টান। তাই প্রতি বছর এই ২৫ শে ডিসেম্বর সবাই একসাথে দিনটাকে উপভোগ করে। সবাই এসে গেছে রবিনের বাড়িতে। রবিন বেশ ভালোই সাজিয়েছে নিজের বাড়িটাকে। খ্রীষ্টমাস ট্রি টাও খুব সুন্দর সাজিয়েছে। সবাই মিলে বসে স্ন্যাক্স, ড্রিঙ্কস, গল্প, হৈহুল্লোর হচ্ছিল, সাথে মিউজিক সিস্টেমে গান। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ রনি বলল, "রবিন!! গেটে কেউ এসেছে মনে হয়। কলিং বেলের আওয়াজ পেলাম।"
রবিন : "কোথায় আওয়াজ? আমি কোনো আওয়াজ পেলাম না তো!!"
অরূপ : "না রে!! আমিও শুনতে পেলাম।"
রবিন মিউজিক সিস্টেমের ভলিউমটা কম করে দিলো। একটু পর আবার বেল বেজে উঠলো।
রবিন : "আচ্ছা আমি দেখছি, তোরা এনজয় কর।"

রবিন গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু বাইরে তো কেউ নেই। এদিক ওদিক ভালো করে দেখে নিয়ে কেউ বাদমায়েসি করেছে  ভেবে দরজাটা বন্ধ করতেই যাবে, দেখলো পায়ের কাছে একটা গিফট বক্স।
বাক্সটা দেখে একটু বেরিয়ে এসে আবার এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। কিন্তু দূর দূর পর্যন্ত কারোর ছায়াটুকু দেখতে পেলো না। বাক্সটা হাতে নিয়ে গেট বন্ধ করে ভেতরে চলে এল। কিন্তু চোখে মুখে চিন্তার ছাপ।
অরূপ : "কি হলো রে? কে ছিল? আর এটা কি?"
রবিন : " আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা বাইরে কে ছিল আর বাক্সটা কে দিয়ে গেলো। শুধু এটাই বাইরে রাখা ছিল।"
রনি : "আজকে তো বড়দিন। তাই হয়তো কেউ সারপ্রাইজ গিফট দিয়েছে তোকে।"
স্মিতা : " যদি কেউ গিফট দিতে আসে তাহলে এভাবে দিয়ে পালাবে কেন? আর কুরিয়ার সার্ভিসের লোক এলে তো সেটা হাতেই দিতো।"
রনি : "হতে পারে অনেকক্ষণ থেকে বেল বাজাচ্ছিল আমরা শুনতে পাইনি। তাই দিয়ে চলে গেছে।"
রবিন : " কিন্তু কোনো কুরিয়ার যদি দিতো তাহলে তো কুরিয়ার সার্ভিসের নাম থাকতো। এখানে তো কিছুই লেখা নেই।"
মানালি : " আরে এতো কেন চিন্তা ভাবনার কী আছে। বাক্সটা খুলেই দেখ না কি আছে।"

        রবিন বাক্স টা খুলে ফেলল। দেখলো তার মধ্যে কিছু কাগজ-পত্র রাখা আছে সাথে একটা খোলা চিঠি....

" প্রিয় রবিন ,
     তোমার সেই ছোটবেলার একটা চাওয়া ছিল যেটা আজকে পূরণ করলাম। আমার পক্ষ থেকে তোমার বড়দিনের উপহার।
                                                             ভালোবাসার সাথে,
                                                                 -সান্তাক্লজ "

চিঠিটা পরে সবাই বলল, "দেখলি তো, বললাম কেউ গিফট দিয়েছে তোকে।"
রবিন : " কিন্তু এই কাগজ গুলো কীসের? এটা কেমন গিফট?"

রবিন কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল সেটা একটা দলিল। কিনতু দলিলটা পড়ে সে অবাক হয়ে গেলো। এর ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলো। ওর ভাব দেখে সকলেই একদম চুপ মেরে গেছে।
স্মিতা : "কী হলো রে? কি লেখা আছে ওতে?"
রবিন তখনো বিস্ময়ের ঘোরটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্মিতা দলিলটা রবিনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পড়তে লাগল। আর তারপর জোরে জোরে হাসতে লাগলো। এবার সকলেরই কৌতুহল হচ্ছে।
স্মিতা : " এতে লেখা আছে হাজিগড়ের রাজা অজিত সিংহ তাঁর প্যালেসটা রবিনের নামে লিখে দিয়েছে। এখন থেকে রবিনই সেই প্যালেসের মালিক।"
মানালি : "হাজিগড়ের অজিত সিংহ?"
রবিন : হুমম!!
এবারে স্মিতার সাথে আর সকলেই হাসিতে ফেটে পড়ল। কিন্তু রবিন সকলের সাথে হাসিতে যোগ দিতে পারছিল না। সে বলল, "চুপ কর!! এটা কি এপ্রিল মাস নাকি যে এপ্রিল ফুল করবে আমাকে?"
অরূপ : "আরে বাবা.. রাজত্ব না থাকলেও তো অজিত সিংহ একজন রাজা-ই। আর রাজা না হলেও একজন বিখ্যাত রাইটার, পেইন্টার। রীতিমত সেলিব্রিটি। তাঁর এতবড় প্যালেস শুধু শুধু তোর নামে করবে কেন? কেউ মজাই করেছে (হাসতে হাসতে)।"
রবিন একটু গম্ভীরভাবে বলল, "কিন্তু তোরা চিঠিটা একবার ভালো করে পড়, লেখা আছে ....'তোমার সেই ছোটবেলার একটা চাওয়া ছিল যেটা আজকে পূরণ করলাম। '...আমার ছোটবেলার কোনো চাওয়া অন্য কেউ কী করে জানতে পারে? আর এটা সত্যি যে ছোটবেলায় আমি ওই প্যালেসটার মালিক হতে চাইতাম।"

                                                          (........পরবর্তী অংশ  )

    
                                                                   - মনোজ রায়

" রিমির মৃত্যু রহস্য - প্রথম অংশ " - মনোজ রায়

সকাল সকাল স্নান সেরে লালপাড় হলুদ শাড়িটা পড়ে তৈরী হয়ে নিল অদিতি। তারপর পুজোর থালা হাতে বেরিয়ে পড়ল মন্দিরের দিকে।
-- "পুজোটা দিয়ে দেবেন ঠাকুরমশাই।"
-- "এবছরও পুজো দিচ্ছ মা?"
-- "আজকের দিনটা আমি কি করে ভুলি বলুন তো? ও থাক আর না থাক, যতদিন আমি থাকব এই দিনটাতে ওর নামে পুজো হবেই।"

        অদিতি প্রতিবছর এইদিনটাতে রিমির নামে মন্দিরে পুজো দেয়। আজ রিমির জন্মদিন। অদিতির বোন রিমি। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর দিদি অদিতিই রিমির সব। অদিতির বিয়ে হয়ে গেছে। রিমি এখন কলেজে পড়ে। কলেজে ওঠার পর ও কলেজ-হোস্টেলেই থাকত। থাকত.., কারণ এখন থাকে না। গত দুমাস ধরে ওর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত পরিচিতদের বাড়িতে খোঁজ না পাওয়ায় পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি। "কোথায় যে গেল মেয়েটা!! কি এমন হল যে ও আমাকেও বলে গেল না। তুই ফিরে আয় বোন, ফিরে আয়। তোর দিদি তোকে খুব মিস করছে রে!!" মন্দিরে বসে রিমির কথা ভাবতে ভাবতেই অদিতির চোখ থেকে জল পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ মন্দিরে বসে তারপর বাড়ির দিকে রওনা হল। অদিতি গাড়ি নিয়ে এসেছে। নিজেই ড্রাইভ করে। কিনতু কিছুটা যাওয়ার পরেই, "দিদি!! দিদি!!" একটা চেনা ডাকে জোরে ব্রেক কষল অদিতি। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে দেখল একটি মেয়ে দৌড়ে আসছে। আরে এটা তো.. অদিতি দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আর মেয়েটিও ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার দিদির বুকে। প্রাথমিক আবেগ কেটে যাওয়ার পর তারা গাড়িতে উঠে চলে গেল। কত হাসি-কান্নার রোল উঠল তাদের মনে। তবু তাদের কথা যেন আর ফুরোতে চায় না। তারপর দুপুরে কিছু খেয়ে দুজনে আবার বেরিয়ে পড়ল গাড়ি নিয়ে। এবারের গন্তব্য রিমির হোস্টেল।

        রিমির কলেজ বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০ কি.মি.। অনেকটা সময়ের ব্যাপার। তাই বাড়ি থেকে যাওয়া আসা না করে হোস্টেলে থাকে রিমি। হোস্টেলটা কলেজ ক্যাম্পাসেই, পিছনের দিকে।
-- "তুই গাড়িতে বসে থাক। আমি হোস্টেল-ইন-চার্জকে বলে সব জিনিসপত্র বাড়ি নেওয়ার ব্যবস্থা করে আসছি।" এই বলে অদিতি সোজা ইনচার্জ-এর  রুমের দিকে চলে গেল। রিমির এই কলেজে ভর্তির সময় অদিতি এসেছিল। এছাড়াও কয়েকবার কলেজে, হোস্টেলে এসেছে এর আগে। পরীক্ষার সময় পড়ার চাপ থাকলে বা অন্য কোন কারণে রিমি বাড়ি যেতে না পারলে তখন অদিতি এসে বোনের সাথে দেখা করে যেত। কিছু দরকার থাকলে কিনে দিয়ে যেত। তাই এই কলেজের সবকিছু তার জানা। তাই হোস্টেল-ইন-চার্জও ওকে ভালমতোই চেনেন।
-- "আসতে পারি ?"
-- "আরে মিসেস ব্যানার্জি!! আসুন। বলুন।"
-- "আসলে আমি এসেছি রিমির জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতে।"
-- "ও হ্যাঁ..। ওগুলো তো এখনো রয়ে গেছে। সব তেমনভাবেই রয়েছে। আপনি নিয়ে যেতে পারেন।" তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সে তো আর ফিরে আসবে না। জিনিসপত্রগুলো...."
-- "এরকম কেন বলছেন? ও তো ফিরে এসেছে। এখানেও এসেছে আমার সাথে।
কথাটা শুনে মিসেস রায় (ইন চার্জ) একটু থতমত খেয়ে গেলেন। অবাক হয়ে অদিতির দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
-- "কি হলো ম্যাডাম ?"
-- "না মানে.., রিমি আপনার সাথে এসেছে?"
-- "হাঁ আমার সাথেই এসেছে। ও গাড়িতে অপেক্ষা করছে। এতদিন পর ফিরেছে, তাই বললো আপনার সাথে কথা বলে ওর জিনিসপত্রগুলো নিয়ে নিতে আর আপনাকে যেন বলে দি যে ও এখন আর আসবেনা এখানে। আমিও আর জোর করলাম না।
-- "আপনি ওকে ফোন করে এখানে আসতে বলতে পারবেন?" একটু ইতস্ততভাবে জিজ্ঞাসা করলেন মিসেস রায়।
-- "হ্যাঁ!! এক মিনিট, ডাকছি ওকে। ওর কাছে তো কোনো ফোন নেই। আমি ডেকে আনছি।"
-- "না দাঁড়ান। আমিই আসছি আপনার সাথে। "
গাড়ির কাছে এসে অদিতি বলল, "রিমি.. এইযে ম্যাডাম এসেছেন তোকে দেখবেন বলে।" কিন্তু গাড়ির ভেতর উঁকি মেরে দেখে কেউ নেই।
"কোথায় গেলো রিমি..?? এইতো একটু আগেই ছিল এখানে। আমাকে বললো অপেক্ষা করবে.., হয়তো ওর বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে গেছে। একটু অপেক্ষা করুন, এক্ষুণি চলে আসবে।"
-- "আপনি ভুল দেখেছেন মিসেস ব্যানার্জী। এ হতে পারেনা। ও আসতেই পারেনা। "

                      

                                                                                                               (......পরবর্তী অংশ  )
                                                                                                                            - মনোজ রায়