সোমবার, ১০ জুলাই, ২০১৭

" রিমির মৃত্যু রহস্য - দ্বিতীয় অংশ " - মনোজ রায়



      অদিতি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "এরকম কেন বলছেন? ও তো আমার সাথেই এলো। কত গল্প করলাম আমরা। একসাথে খেলাম। তারপর ও নিজেই বললো হোস্টেলে আসতে, আপনার সাথে দেখা করে... "
— "অদিতি মৃত মানুষ কখনো ফিরে আসেনা।"


অদিতি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মিসেস রায়-এর দিকে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
— "মৃত মানুষ?? আমার রিমি বেঁচে আছে। আমার সাথেই ছিল সারাদিন। আজ ওর জন্মদিন আর আজকের দিনে আপনি এরকম কী করে বলতে পারেন?"
— "মিসেস ব্যানার্জী, আপনি আমার ঘরে চলুন। আমি আপনাকে সব বলছি।"
দুজনেই ঘরে এসে বসলেন। একটু সময় নিয়ে ইন-চার্জ বললেন, "রিমি দুমাস আগেই মারা গেছে। হোস্টেলেই। স্যুইসাইড।"
এবার আর অদিতির চোখের জল বাঁধা মানল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। অদিতির মনে হচ্ছে যেন এবার ও সত্যি সত্যি বোনকে হারিয়ে ফেলল। এতদিন কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও ওর মনে একটা আশা ছিল হয়ত রিমি ফিরে আসবে। কিন্তু আজকে এই কথা শোনার পর অদিতি বুঝে গেছে যে রিমি আর কোনদিন ফিরবে না। এটা যেন ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। মিসেস রায় নেজের চেয়ার ছেড়ে এসে ওকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন।

অদিতি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, "কি হয়েছিল? বলুন আমাকে।" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস রায় বলতে শুরু করলেন- "সেদিন ছিল রবিবার। কলেজে

তিনদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছিল। তাই অনেকেই শনিবার রাতে বা রবিবার সকালে বাড়ি চলে গিয়েছিল। রিমিকে নিয়ে নয়জন মতো ছিল হোস্টেলে। তখন রাত প্রায় দশটা। আমি ঘরেই ছিলাম। এমন সময় একজনের চিৎকার শুনলাম। জানলা খুলে বাইরে কিছু দেখতে পেলাম না। কিছুক্ষণ পরে সাত-আটজন মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এলো আমার ঘরে।"
— "ম্যাডাম রিমি...!!"
— "কি হয়েছে রিমির?"
— "আমরা সবাই খাওয়ার পরে ছাদে বসে গল্প করছিলাম। রিমিও ছিল আমাদের সাথে। এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ছাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে দিলো। আমরা খুব ঘাবড়ে গেলাম। কিছু না বুঝতে পেরে আপনার কাছে এলাম। আমাদের খুব ভয় লাগছে।
— "সে কি..!! কী সব বলছো তোমরা? কোথায় ঝাঁপ দিলো? কেন? আমাকে দেখাও.. চল তোমরা।"
— "সেখানেই পড়ে আছে ম্যাডাম। আমরা কিছু করিনি।"
— "আচ্ছা চল, আগে রিমিকে দেখি।"
এই বলে মিসেস রায় একটু থামলেন। অদিতির চোখ থেকে সমানে জল গড়িয়ে পড়ছে তখনো। জিজ্ঞেস করল, "তারপর??"
— "আমি সবার সাথে গেলাম সেখানে। কাছে গিয়ে দেখলাম রিমি আর নেই। রিমি খুব ভালো মেয়ে ছিল। এভাবে ছেড়ে তো দেওয়া যায়না। তাই তাড়াতাড়ি কলেজ ট্রাস্টি কে কল করে সব কিছু জানালাম। মিঃ সেন বিরক্ত হয়ে বললেন, 'এটা যেন কোনো ভাবেই জানাজানি না হয়। কোনভাবেই যেন কলেজের বদনাম না হয়। তুমি আপাতত স্টুডেন্টদের হ্যাণ্ডেল করো। আমি দেখছি।' এই বলে উনি কলটা কেটে দিলেন। রিমির জন্য খারাপ লাগলেও ওপরমহলের কাছে আমার হাত-পা বাঁধা ছিল। সেদিন ওনার নির্দেশ মতোই সবাইকে জানানো হয়েছিল যে রিমিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"

 "কিন্তু আমার বোন সুইসাইড করেছে এটা আমি কোনোমতেই মানতে পারবনা। ও খুব সাহসী। কিছু নিশ্চয়ই লুকোচ্ছেন আমার কাছে। নইলে হোস্টেলেই লুকিয়ে আছে ওর সুইসাইড করার কারণ।"

এটা শুনে মিসেস রায় ঘাবড়ে গেলেন, "আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে
পারছি। কিন্তু যা হয়েছে তাতে আমাদের কোন দোষ ছিল না। তাছাড়া রিমি তো ফিরে আসবে না। আর আপনি যদি পুলিশে কমপ্লেইন করেন আমার যা হয় হবে। কিনতু সাথে ওই সাত-আটজন মেয়ের লাইফও নষ্ট হয়ে যাবে। প্লিজ এরকম কিছু...."
মিসেস রায়ের কথা শেষ হতে পারল না। তার আগেই একটা তীক্ষ্ন চীৎকারে বুক কেঁপে উঠল। শব্দের আকস্মিকতায় সকলেই স্তম্ভিত। তারপর দুজনেই ছুটলেন আওয়াজ লক্ষ্য করে, হোস্টেলের দিকে।
করিডোরে অনেক মেয়ে জটলা করে আছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল একটা মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার মুখে-চোখে জলের ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হয়েছে। কিন্তু সে অঝোরে কেঁদে চলেছে। তার হাত-পা কাঁপছে, আর বারবার রিমির নাম নিচ্ছে। এবার মিসেস রায় যেন হঠাৎ করে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন তাকে নিয়ে, "কিছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে যাবে" বলে কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু অদিতির একটু অবাক লাগল। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, "কী হয়েছে? বারবার রিমির নাম করছ কেন?"
তখন মেয়েটি যা বলল তাতে সকলেরই গায়ে কাঁটা দিল, "রিমি.. রিমি এসেছিল। ওখানে দাঁড়িয়েছিল।


                                                  
                                                                          (........শেষ অংশ )

                                                                           - মনোজ রায়

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মতামত দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ , খুব শীঘ্রই আপনাকে উত্তর দেওয়া হবে :-)