সোমবার, ১০ জুলাই, ২০১৭

" বড় দিনের উপহার - দ্বিতীয় অংশ " - মনোজ রায়



রবিনের ছোটবেলার ইচ্ছের কথা শুনে সত্যিই সবাই অবাক হয়ে গেল। প্রায় একসাথেই জিজ্ঞাসা করল সবাই, "মানে?"
রবিন : "ছোট বেলায় টিভিতে ওই প্যালেসটা বারবার দেখাতো এক্সিবিশনের সময়ে। তখন ওই প্যালেসটা দেখতাম আর  বাবাকে বলতাম,"বাবা একদিন ওই বাড়িটা আমার হবে আর তুমি ওখানে রাজা হবে।" বাবা হাসতো আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতো, "বোকা ছেলে!! ওটা রাজাদের মহল। কোথায় ওরা রাজা আর কোথায় আমরা সাধারণ মানুষ। ওসব শুধু স্বপ্নতেই হতে পারে।"


নীল : "আরে..!! হতেই তো পারে এটা জাস্ট একটা কো-ইন্সিডেন্স। সত্যিই কেউ মজা করেছে আর কোনক্রমে ব্যাপারটা মিলে গেছে। নাহলে কোথায় অজিত সিংহ আর তুই কোথাকার রবিন.., তোর নামে এতো বড় একটা প্যালেস লিখে দেবে?"
মানালি : "শোন না!! গুগল এ একবার সার্চ করে দেখ না অজিত সিংহের নামে কিছু পাওয়া যায় কিনা।"
নীল : " হুমম স্মিতা একদম ঠিক বলেছে ,একবার সার্চ করে দেখ তো কিছু দেখায় কিনা।
রবিন টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা অন করলো। গুগল সার্চ এ টাইপ করলো- "information about maharaja Ajit Singh , hajigarh" সেকেন্ডের মধ্যে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা তথ্য- " Today  morning (25 .12 .
2015 ), at 9.30 a.m, the  famous writer and painter Maharaja Ajit Singh has died. As he was the last person of Raja Bikram
Singh family, he has written all his property to an unknown

person before his death. No one know about that person except his advocate till now."
এটা দেখা মাত্র রবিনের হৃদস্পন্দনের বেগ  যেন আরো বেড়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে দলিলটা হাতে নিয়ে দেখল তাতে অজিত সিংহের সই রয়েছে। আর নিচে লেখা তারিখটা ২৫/১২/২০১৬। এখন রবিনের মনে ভিড় করে এসেছে অনেক প্রশ্ন। সকলে মিলেও এই প্রশ্নের কোন সমাধান সূত্র খুঁজে পেল না। আনন্দ উল্লাসের সাথে পার্টিটা শুরু হলেও মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন নিয়েই সকলে রবিনের কাছ থেকে বিদায় নিলো। শুধু অরূপ বলল,"উইলটা ১০০% আসল। তবে তুই এনিয়ে বেশি চিন্তা করিস না। আমি একবার দেখব না হয় উইলটার ব্যাপারে খোঁজখবর করে।"

        অরূপ হাইকোর্টে চাকরি করে। তাই হয়ত এই আশ্বাসবাণী। কিন্তু রবিন কোনোভাবেই এই প্রশ্নগুলো থেকে নিজের মনকে আলাদা করতে পারছিলোনা। সেইসঙ্গে ওই চিঠির কথাগুলো রবিনকে ঘুমাতে দিচ্ছিল না। পরদিন সকালেও রবিন কাজে মন বসাতে পারল না। আগামীকাল একটা জরুরী কাজ আছে। কিনতু এই ধাঁধাঁর উত্তর খুঁজে না পাওয়া অবধি তার মনের অস্থিরতা কাটবে না। তাই আজকেই হাজিগড় যাবে ঠিক করল। কলকাতা থেকে হাজিগড় যেতে মোটামুটি দু-আড়াই ঘন্টা মত লাগে গাড়িতে। এখন বেরিয়ে পড়লে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসতে পারবে। তারপরে কালকের কাজগুলো সারতে হবে। তাই আগে কিছু জরুরী ফোনকল করে নিল। তারপর রওনা হলো হাজিগড়ের উদ্দেশ্যে।

        হাজিগড় যেতে মোটামুটি দুটো জাতীয় সড়ক ক্রস করতে হয়- ১১৭নং আর ৬নং| তাই যানজটের ঝক্কি তেমন নেই। তাছাড়া, অঞ্চলটা একটু সবুজে ঘেরা। তারওপর আবার গন্তব্য রাজবাড়ি। মোটকথা, যাত্রার এই সময়টা মন্দ কাটল না ওর। হাজিগড় স্টেশনর কাছে এসে একজনকে জিজ্ঞাসা করে নিল প্যালেসে যাওয়ার রাস্তাটা। স্টেশান থেকে এই.. দু-মিনিট মত গিয়ে একটা বিরাট গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। গেটের দুপাশে দুটি সাদা মার্বেলের হাতি। আর দুজন সশস্ত্র দারোয়ান। রবিনের গাড়ি এসে দাঁড়াতেই একজন বেরিয়ে এসে রীতিমত জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে
দিল-- "কী করেন","কোথায় থাকেন","কেন এসেছেন" আরো কত কী। কিন্তু যেইমাত্র শুনল যে রবিন প্রপার্টির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছে,তৎক্ষণাৎ ওর ভেতরে প্রবেশ
নিষিদ্ধ হয়ে গেল। আসলে প্রপার্টি নিয়ে অজিত সিংহের এরকম একটা সিদ্ধান্তের জন্যই হয়ত এত কড়াকড়ি। তাই অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনোভাবেই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেলোনা রবিন। অনেকরকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শুরু হল চিৎকার চেঁচামেচি। এর মধ্যেই একজন কাউকে যেন ফোন করল। একটু পরে একজন বয়স্কলোক বেরিয়ে এলেন।
--- "নমস্কার! আমি রাজবাড়ির দেওয়ান। কী প্রয়োজন বলুন।"
--- "আমি শুনলাম যে রাজাবাবু তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কোন একজন অজ্ঞাত ব্যাক্তিকে দান করে গেছেন। একথা কী সত্যি?"
রবিনের মুখে একথা শুনে দেওয়ান জীর চোয়াল একটু শক্ত হয়ে গেল। বললেন, "কোন অজানা অচেনা ব্যাক্তির সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করা চলে না। এটা অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়।"
---"জানি। কিন্তু কাল রাতে এটা আমি পেয়েছি", বলে রবিন ব্রিফকেস থেকে উইলটা বের করে দিল। দেওয়ানজী সেটা হাতে নিয়ে দেখে বুঝলেন উইলটা আসল। তখন রবিনকে ভেতরে আসতে বললেন। রবিন গাড়িটা গেটের বাইরেই পার্ক করে দেওয়ানজীর পিছু পিছু চলল। গেট দিয়ে ঢুকেই মোরাম বিছানো রাস্তা। দুপাশে সাজানো বাগান। মূল প্রাসাদের সামনে একটা ফোয়ারা। সেখানকার স্বচ্ছ জলে আধফোঁটা পদ্মরাশির মাঝখানে এক অর্ধনগ্ন এলোকেশীর প্রস্তরমূর্তি। মূর্তির চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। মনে হয় যেন এই অষ্টাদশীর সৌন্দর্য আস্বাদনের জন্য সময় তার স্নানের মুহূর্তটিতেই স্থির হয়ে গেছে। ফোয়ারার পরে গাড়িবারান্দা। সেখানে খানচারেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়িবারান্দা পেরিয়ে ওরা ঢুকল একটা বড় হলঘরে। হলঘরের ভেতর দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দুদিকে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে একটা কোণের দিকের ঘরে গিয়ে ঢুকল দুজন। এটা একটা অফিস ঘরের মত। চারিদিকে থরে থরে কাগজপত্র রাখা। একপাশে গদি-আঁটা চৌকির ওপর একটা নীচু টেবিল। অন্যপাশে গুটিকতক গদি-আঁটা চেয়ার।

দেওয়ানজী আমাকে সেখানে বসতে বললেন। তারপর কথা শুরু করলেন, "গোড়া থেকে আমাকে ঘটনাটা খুলে বলুন তো।"
সেদিন রাতে যা যা হয়েছিল সবকিছু খুলে বলল রবিন। সেইসঙ্গে ওই চিঠিটার কথাও বলল। সব শুনে দেওয়ানজী বললেন, "কিন্তু আপনি যে সত্যিকথা বলছেন তার কী
প্রমাণ আছে?"

রবিন একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলল,"দেখুন, আমার এই
প্রপার্টির ওপর কোন লোভ নেই। আপনি যদি ওই চিঠিটার কথা বলেন, তবে বলব ছোটবেলায় এরকম দু-একটা অদ্ভুত ইচ্ছা সকলেরই থাকে। সেটাকে সত্যি ভেবে

নেওয়ার কোন মানে হয়না। যদিও ওই চিঠিটা আমাকেও অবাক করেছে, কারণ তাতে লেখা কথাগুলো সত্যি। আর আপনি যদি এটা বলতে চান যে এটা জাল উইল তবে বলব, সেটা হতেই পারে। কারণ আমাকে কেউ নিজে হাতে করে এটা দেয়নি। তবে এবিষয়ে আমার ওপর সন্দেহ করা অমূলক। কারণ রাজাবাবু কাল সকালেই মারা গেছেন। সেই খবর শোনার পর একবেলার মধ্যে নিশ্চই আমার পক্ষে জাল উইল তৈরী করা সম্ভব নয়।"
---"হমমম..!!
--- "আর তাতেও আপনার সন্দেহ না কাটলে আপনি নিজে এই উইলটা যাচাই করে নিতে পারেন কিংবা এই চিঠি" এই বলে রবিন চিঠিটা বের করে দেওয়ানের হাতে দিল। তারপর বলল,"আচ্ছা.. ওই চিঠির লেখাটা কী রাজাবাবুর হাতের লেখা বলে মনে হয় আপনার?"
---"হ্যাঁ।"
---"কিন্তু..."
---"তোমার নাম কী?"
---"রবিন.. রবিন ডি'সুজা।"
---"তোমার বাবার নাম?"
---"আর্ভিন ডি'সুজা।"

রবিন লক্ষ্য করল তার বাবার নাম শুনে দেওয়ানজী যেন চমকে উঠলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,"তোমার মা কী সারা?"
দেওয়ানের কথা শুনে রবিন অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল,"আপনি আমার মাকে চেনেন?"
---"এই উইল রাজাবাবু তোমাকেই পাঠিয়েছেন রবিন। এখন এই প্যালেসের একমাত্র উত্তরাধিকারী তুমি।"
                                                            
                                                        (........পরবর্তী অংশ  )


                                                                      - মনোজ রায়

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মতামত দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ , খুব শীঘ্রই আপনাকে উত্তর দেওয়া হবে :-)